শনিবার, ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৫ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পপসম্রাট আজম খান: বাংলার অমলিন সুরের প্রতিভা

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে আধুনিক পপ ধারার পথিকৃৎ একজন অসাধারণ শিল্পী আজম খানের আজ জন্মদিন। তার জন্ম ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। সংগীতের জগতে তার অবদান অপরিসীম, বিশেষ করে আধুনিক পপ সংগীতের জন্য যে ধারাটা তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা আজও অজস্র প্রজন্মের হৃদয়ে রাজত্ব করে। ব্যান্ডসংগীতকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে তিনি এক নতুন স্রোত সৃষ্টি করেছিলেন, যা দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তরুণ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখাতে শেখানো, নতুন গানের মাধ্যমে তাদের মনোভাব প্রকাশের সুযোগ করে দেওয়া—এসব তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ২০১১ সালে, ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর এই কিংবদন্তি শিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তার গান ও সৃষ্টির সরসরাই আজও সমান প্রাসঙ্গিক, যার মাধ্যমে তিনি আজীবন অমর হয়ে থাকবেন।

শৈশব ও কৈশোরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার ভেতরে প্রতিবাদী ভাবনা গড়ে উঠেছিল। স্কুলজীবনে তিনি পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্যমূলক আচরণের মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই সময় তিনি ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গণসংগীতের চর্চা শুরু করেন এবং বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে গান গেয়ে সাধারণ মানুষের কথা তুলে ধরতেন। তার গানগুলি প্রতিবাদী সুরে ভরা, পুলিশি লাঠিপেটার সম্মুখীনও হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন গণআন্দোলনের দিনগুলোতেও তিনি ছিলেন সক্রিয় একজন কণ্ঠ।

আজিমপুর ও কমলাপুরে তার শৈশব কাটে, যেখানে ভাষা আন্দোলনের উত্তাপ তার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। জানালা দিয়ে তিনি দেখতে পেতেন মাতৃভাষার জন্য মানুষের জড়ো হওয়া, আর বাইরে ধ্বনিত হত ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’, ‘কইমু না ভাই কইমু না’ gibi বিভিন্ন গানের আওয়াজ। স্কুলের শারীরিক শিক্ষার ক্লাসে সে সময় তিনি সঙ্গীতের জন্য শুধু বন্ধুদের সঙ্গে গাইতেনই না, খুব দ্রুত গানের কথা ও সুর মনে রাখতে পারতেন।

জীবনের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, আব্দুল আলিম, শ্যামলের গান আমি তাদের মতো করেই গাইতাম।’ গানের প্রতি তার এই আগ্রহ প্রবল ছিল, বলে মনে হয়। আরও এক স্মৃতিচারণে তিনি বলেছিলেন, ‘গান শুনে হুবহু গাইতে পারতাম, যা অনেকের জন্য বিস্ময়কর ছিল।’ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি নিজের সংগীতের মাধ্যমে দেশের জন্য নিবেদিত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে গানে সজ্জিত হয়ে তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের মনোবল বাড়িয়েছেন। তিনি বলে গিয়েছিলেন, ‘যুদ্ধের শুরুতে আমি পাকিস্তানি আর্মিদের গাড়ি দেখে দেয়াল টপকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটতে থাকতাম।’

সেখানে কঠোর সংগ্রামে নিজেকে সংগীতের মাধ্যমে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাখতেন তিনি। স্বাধীনতা অর্জনের পর সংগীতের দিকে আরও মনোযোগী হয়ে উঠেন। বিটলস, দ্য শ্যাডোজ, রোলিং স্টোনের মতো পশ্চিমা ব্যান্ডের গান শুনে তিনি অনুপ্রাণিত হন এবং তার বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত সঙ্গীতানুষ্ঠানে অংশ নিতেন। দেশজুড়ে তার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত।

তাঁর গানে উঠে এসেছে বঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষের জীবনমুখী গল্প। দেশপ্রেম, সচেতনতা এবং তরুণদের উদ্দীপনা তাঁর সুরের মূল উপজীব্য। নানা বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও তিনি থেমে থাকেননি; ‘রেললাইনের ওই বস্তি’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘এত সুন্দর দুনিয়ায়’, ‘অভিমানী’, ‘অনামিকা’, ‘পাপড়ি’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘আসি আসি বলে তুমি আর এলে না’, ‘আমি যারে চাইরে’, ‘জ্বালা জ্বালা’, ‘ও চাঁদ সুন্দর’, ‘ও রে সালেকা ও রে মালেকা’, ‘জীবনে কিছু পাব না রে’, ‘বাধা দিয়ো না’—এমন অসংখ্য গান তাকে অমর করে রেখেছে। আজম খানের সংগীতের এই অসামান্য ধারাটি যথার্থই বাংলার অমলিন উত্তরাধিকার হিসেবে চিরজাগরুক থাকবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন