রবিবার, ১লা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতিই ব্যবসায় প্রধান বাধা: কর, ব্যবসা ও ব্যাংকে ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে ন্যায়পাল চান সিপিডি

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) মনে করছে, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সবচেয়ে বড় অন্তরায় দুর্নীতি। এ সমস্যা কমাতে সংস্থাটি কর ন্যায়পাল, ব্যবসাজনিত ন্যায়পাল ও ব্যাংক ন্যায়পাল—মোট তিন ধরনের ন্যায়পাল নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়ে এবং অবৈধ অনুশীলন কমে।

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সিপিডি কার্যালয়ে “নতুন সরকারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত: ১৮০ দিন ও তারপর” শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এসব সুপারিশ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্যবসা পরিচালনায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অনেক সময়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন করতে হয়, যা দুর্নীতিকে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত করেছে। তাই কর, ব্যবসা ও ব্যাংক খাতে পৃথক ন্যায়পাল থাকা জরুরি—যারা অভিযোগ মেটাবে, বিরোধ নিষ্পত্তি করবে এবং নীতিমালার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিতে কাজ করবে।

মোয়াজ্জেম জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজস্ব আহরণ অত্যন্ত দুর্বল ছিল এবং এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত স্বল্পতমের মধ্যে একটি। বর্তমান সরকার রাজস্ব আহরণকে ৪ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সম্পদ কর সংযোজনসহ বিভিন্ন প্রস্তাব থাকলেও কর ন্যায্যতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার অনুরোধ জানান তিনি।

কর বৈষম্য কমাতে সিপিডি সুপারিশ করেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর মধ্যে একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা উচিত, যারা নিয়মিতভাবে কর অব্যাহতি, কর ফাঁকি, কর ছাড় ও কর আহরণ পর্যবেক্ষণ করবে। ভ্যাট কাঠামো সহজ করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে—বর্তমান ৮টি স্ল্যাব ধাপে ধাপে ৩টিতে নামিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে ২টি স্ল্যাব বা একক হারে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

এছাড়া এনবিআরের কর অবকাশ (ট্যাক্স-হলিডে) নীতির পুনর্বিবেচনার কথাও বলেন মোয়াজ্জেম। বিশেষ করে বিনোদন ক্লাব, পুঁজিবাজারের মতো খাতে যেসব কর অবকাশ আছে সেগুলোর যৌক্তিকতা পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত। খাতভিত্তিক ও জ্বালানিভিত্তিক কর ছাড় তুলে দিয়ে সমন্বিত একক নীতির আওতায় সুবিধা দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি। ব্যক্তি ও শ্রেণিভিত্তিক নয়, সব ধরনের ব্যবসার জন্য অনলাইন কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করার কথাও বলেন।

ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা চালু করার দাবি আছে; আন্তর্জাতিক কর ফাঁকি রোধে বৈশ্বিক গাইডলাইন অনুযায়ী সহযোগী চুক্তি ইনক্লুড করার পরামর্শ দেন তিনি। এনবিআরের ভেতরে একজন স্বাধীন পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানো যেতে পারে—এই ধারনাও সংশ্লিষ্টদের কাছে তুলে ধরেন। রিসার্চাররা রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আলাদা দুই ভাগে ভাগ করে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে। নতুন সরকার দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে; সেই প্রেক্ষাপটে সিপিডি এই মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে এবং শুরুতেই বাস্তবসম্মত, ধারাবাহিক ও জবাবদিহিমূলক নীতিমালা গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছে।

সিপিডি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে নতুন সরকারের শুরুর সময়ে ঘোষিত নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা না থাকা সাধারণ প্রবণতা—প্রধান কারণ হিসেবে তারা প্রশাসনিক অনাগ্রহ, আইনি জটিলতা ও নির্বাচনী অঙ্গীকার থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছেন। তাই সংস্থাটি বিকেন্দ্রীকৃত, জ্ঞানভিত্তিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নীতি বাস্তবায়ন কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানায় এবং জাতীয় সংসদের কার্যকর তদারকির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।

সিপিডি তাদের গবেষণার ভিত্তিতে মোট ১২টি অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে সরকারের নীতি ও প্রশাসনিক করণীয় চিহ্নিত করেছে এবং দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন