বৃহস্পতিবার, ২৬শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পাঠিয়েছে ১৫ দফার শান্তি প্রস্তাব

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধের উদ্দেশ্যে ইরানের কাছে ১৫ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র—এ তথ্য কূটনৈতিক বিষয়গুলো ও চুক্তি-আলোচনার সঙ্গে অবগত দু’জন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস। ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে এই পদক্ষেপ যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলার প্রতিফলন বলেও সংবাদটি বলছে।

পাকিস্তান হয়েছে সেই প্রস্তাব পৌঁছানোর মধ্যমণি। তবে ইরানের শীর্ষনেতাদের কাছে প্রস্তাবে কতটা গুরুত্ব পেয়েছে বা তারা এটিকে আলোচনার সূচনা হিসেবে কি গ্রহণ করবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে ইরানে হামলা চালানো ইসরায়েলও এই প্রস্তাবকে সমর্থন করছে কি না—সেদিকে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নিউজআয়ের প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রশাসন প্রস্তাবের একটি অনুলিপি পায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা প্রস্তাবের সাধারণ রূপরেখা শেয়ার করেছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী প্রস্তাবে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কিত বিষয়াবলী এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা সংক্রান্ত দিকগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বৈরী পক্ষগুলোর হামলার লক্ষ্য এখন পর্যন্ত ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও উৎপাদনাগার এবং পারমাণবিক সংক্রান্ত স্থাপনা—এগুলি বলে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বিমান হামলায় মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছেন, তারা এসব লক্ষ্যবস্তুকে লক্ষ্য করে এসেছে এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেবে না বলে পুনরাবৃত্তি করেছেন।

এদিকে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানও ইসরায়েল ও প্রতিবেশী কিছু আরব দেশের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে। বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কিলোগ্রাম উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত থাকার তথ্যও কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন।

আলোচনায় সমুদ্রপথের সুরক্ষাও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বারগুলোতে কার্যত নৌ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে এবং জ্বালানির দাম বাড়ছে।

তবে সামনে যে যুদ্ধ দ্রুত থেমে যাবে—সেই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ধারণা করছেন সংঘাত কয়েক সপ্তাহ আরও বাড়তে পারে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে, কিন্তু একই সঙ্গে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পেন্টাগনের নির্ধারিত সামরিক লক্ষ্য অর্জনে অভিযান চালানো হবে বলেও জানিয়েছেন।

কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির এই মধ্যস্থতায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। মিশরের ও তুরস্কের ছাড়াও আরও কয়েকটি দেশ ইরানকে আলোচনায় বসাতে গুরুত্ব দিচ্ছে। মুনিরের সঙ্গে ইরানের উচ্চকমান্ডার কিছু পর্যায়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে তাঁকে দুই পক্ষের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকরা।

ফিল্ড মার্শাল মুনির নাকি ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর এক শীর্ষ কমান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং পাকিস্তানকে আলোচনা-ভেন্যু হিসেবে প্রস্তাব দিয়েছেন—এমন কথাও কর্মকর্তারা বলেছেন। পাকিস্তানের নেতারা বলেছেন, দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের স্থায়ী শাস্ত্রবিহীন সমাধান খুঁজে পেলে তাতে ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।

তবে ইরানের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিক্রিয়া দ্রুত বাড়তি সিদ্ধান্তে রূপ নিতে পারে না—এই আশঙ্কাও প্রকাশ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে সমস্যা এবং নিরাপত্তার কারণে শারীরিক বৈঠক স্থগিত রাখার প্রবণতা আছে; তারা ভাবছেন, কোনো বৈঠকে হলে ইস্রায়েল সেখানে আঘাত করতে পারে।

কয়েকটি বক্তব্য ও কিছু তথ্য উন্মুক্ত হলেও কিছুকে এখনও যাচাই করা যায়নি। বিশেষত যুদ্ধের প্রথম দিন বা পরে তেহরান লক্ষ্য করে কোনো নির্দিষ্ট হামলা বা লক্ষ্যভিত্তিক হত্যার ঘটনাবলীর ব্যাপারে বিভিন্ন দাবি আছে—এগুলো যাচাইযোগ্য নয় বলে অনেক কূটনীতিক ও সংবাদমাধ্যম মন্তব্য করেছেন।

সামগ্রিকভাবে হোয়াইট হাউসের পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়—ট্রাম্প প্রশাসন অন্তত আপাতত এই সংকটটাকে কূটনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে; কিন্তু একই সঙ্গে সামরিক অপারেশনও বজায় রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু—দুই পক্ষই ইরানে শাসনব্যবস্থা বদলানোর ওপর কি অনন্ত আস্থা রাখছেন, বা তা করবেন কি না—এ বিষয়ে এখনও স্থির নেওয়া হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছেন, তারা ইরানের সামরিক সক্ষমতা গুরুতরভাবে ক্ষীণ করেছে; কিন্তু মাঠে বাস্তবতা ভিন্নভাবেই প্রতিফলিত হচ্ছে—সংঘাত আরও তীব্র ও অপ্রত্যাশিত পথে বাড়ছে এবং যুদ্ধ থামানোর কোনো পরিষ্কার পথ মেলে উঠছে না।

পোস্টটি শেয়ার করুন