যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের জবাবে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইস্রায়েলের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালিয়েছে এবং পারস্য উপসাগরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ — হরমুজ প্রণালি — কার্যত নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। ইরানের সামরিক কর্তৃপক্ষ প্রণালি অবরোধ করার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে এবং বিশেষজ্ঞরা তা থেকে বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা করছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে রপ্তানিক্ষেত্রে সরবরাহিত মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)–র প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বহন করা হয়। সংঘাত শুরুর আগে এই নৌপথটি সম্পূর্ণভাবে খোলা ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক বিবাদ ও ইরানের পদক্ষেপ প্রণালিটিকে আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রধান ইস্যু বানিয়েছে।
আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির পরিণামে প্রণালির দুই পাশে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার জাহাজ আটকে আছে। ইরানের স্থানীয় মিডিয়া সূত্রে জানা গেছে, তেল, এলএনজি ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের জন্য জাহাজ থেকে টোল আদায়ের একটি আইন প্রণয়ন করার প্রস্তাব পার্লামেন্টে উঠেছে। তাসনিম ও ফার্সসহ দেশীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পার্লামেন্টের সিভিল অ্যাফেয়ার্স কমিটি একটি খসড়া আইন তৈরি করেছে এবং শিগগিরই ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলি–র আইন বিভাগ তা চূড়ান্ত করবে।
ইরানির এক কর্মকর্তা বলছেন, প্রণালি নিরাপদ রাখতে এই ফি নেয়া হবে। তার ভাষায়, “অন্যান্য করিডরে পণ্য পরিবহনের সময় যেভাবে ফি বা শুল্ক দিতে হয়, হরমুজও অনুরূপ একটি করিডর। আমরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করি, সেই কারণে শুল্ক নেওয়া স্বাভাবিক।”
তবে আইনি কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ইতোমধ্যে একটি টোল ব্যবস্থা কার্যকর করেছে বলে সামুদ্রিক নজরদারি সংস্থা লয়েডস লিস্ট জানিয়েছে। সংস্থাটি জানায়, গত কয়েক সপ্তাহে আইআরজিসি অনুমোদিত রুট ব্যবহার করে কিছু জাহাজ চলাচল করেছে; জাহাজ মালিকদের প্রথমে আইআরজিসি-সংযুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে নথি, আইএমও নম্বর, মালামাল, ক্রু ও গন্তব্যের তথ্য জমা দিতে হয়। যাচাই-বাছাইয়ের পর আইআরজিসি একটি বিশেষ কোড প্রদান করে নির্দিষ্ট রুট নির্দেশনা দেয়; ওই কোড নৌপথে প্রবেশের সময় রেডিওতে যাচাই করা হয়। অনুমোদন পেলে ইরানি নৌবাহিনী নিরাপত্তা দিয়ে জাহাজগুলোকে এগিয়ে নেয়, আর অনুমতি না থাকলে প্রবেশ প্রতিরোধ করা হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানে হামলার সূত্রেই উত্তেজনা তীব্র হয়ে উঠে—ঘটনাপ্রবাহ অনুযায়ী এর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া অনেক মার্কিন ও ইসরায়েলি জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এর প্রভাব দ্রুতই বিশ্ববাজারে পড়েছে; তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা যুদ্ধ-শুরুর সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে এশিয়ার অনেক দেশে জ্বালানি রেশনিং এবং শিল্প উৎপাদন কমায় মাথাব্যাথা বাড়ছে।
কয়েকটি আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থা পর্যবেক্ষণ করছে, অনেক জাহাজ বিকল্প দীর্ঘ পথ বেছে নেওয়ার বদলে প্রণালির পাশে অপেক্ষা করাকে নিরাপদ মনে করছে। মেরিটাইম গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডও বলছে, দীর্ঘ বিকল্প পথে যাওয়ার ঝুঁকি ও খরচের কারণে কিছু মালিক অপেক্ষাই করছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৫ মার্চ থেকে পরবর্তী এক সপ্তাহে মাত্র ১৬টি জাহাজ স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু রেখে প্রণালি অতিক্রম করে, একই সময়ে চারটি কার্গো জাহাজ পার হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে মোট ২৬টি জাহাজ আইআরজিসি-অনুমোদিত রুট ব্যবহার করেছে।
আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে কারণ হরমুজ প্রণালি উপসাগরীয় বেশিরভাগ তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রধান পথ। বহু দেশ জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে ইরান দাবি তুলেছে, যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে তারা হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের কর্তৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চায়। ইরানের এক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি জানিয়েছেন, কিছু ক্ষেত্রে জাহাজ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি নেওয়া হচ্ছে — তিনি বলেছেন, “যুদ্ধের খরচ রয়েছে, তাই ফি নেয়া হচ্ছে।”
চিন, ভারত, মালয়েশিয়া, মিশর ও দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু জাহাজ শর্তসাপেক্ষে প্রণালি অতিক্রম করেছে; জানা গেছে, কিছু নৌযান চীনা মুদ্রা ইউয়ানে ফি পরিশোধ করেছে, যদিও নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি। ভারতের একটি কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, তাদের জাহাজ কোনো ফি দেয়নি।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের বিধান অনুযায়ী আন্তর্জাতিক প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত এবং তা স্থগিত করা যায় না—এই নীতিটি অনেক দেশের তত্ত্বের ভিত্তি। তবে ইরান বলেছে, তারা ওই আইন মেনে চলে না কারণ তারা তা অনুমোদন করেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজের সংকীর্ণ ভূগোল ও ইরান-ওমানের জলসীমার মিলিত অবস্থান পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির প্রধান সুলতান আল-জাবের এই অবস্থা ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করেছেন। তার কথায়, “ইরান যখন হরমুজ প্রণালিকে জিম্মি করে, তার প্রভাব পড়ে বিশ্বের প্রতিটি দেশের অর্থনীতিতে—জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের দামে।”
বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বাণিজ্য-রুট ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও বৈশ্বিক বাজার, নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা—এই তিনটির মিলেই ভবিষ্যতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসতে পারে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।





