রবিবার, ২৬শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হস্তান্তরের আগেই ফাটল: গাইবান্ধার বেকরীরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উদ্বেগ

নান্দনিকভাবে নির্মিত ও মনোরম পরিবেশের কথা বলে উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা গাইবান্ধার বেকরীরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফ্লাড শেল্টারে হস্তান্তরের আগেই ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা গেছে। সরকারিভাবে এ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা (চুক্তিমূল্য ২ কোটি ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬২ টাকা)। চলতি মাসের ১৪ তারিখে বিল্ডিং হস্তান্তর করা হলেও স্থানীয়রা বলছেন, ফাটলগুলোর শিকার হওয়া ছিল আগে থেকেই।

সরেজমিন দেখা গেছে তিনতলা সুদৃশ্য একটি ভবন; দুটি সিঁড়ি আছে—একটি স্বাভাবিক সিঁড়ি, আর একটি র‍্যাম্প, যা নিচ থেকে সরাসরি তৃতীয় তলায় পৌঁছে যায়। সেই র‍্যাম্পজুড়ে অসংখ্য ফাটল থাকায় দুর্ঘটনা এড়াতে র‍্যাম্পের মুখে তালা ঝুলিয়ে সেখানে চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ২৪৯ জন শিশুকে পড়াশোনার জন্য বসানো হলেও বিল্ডিংয়ের প্লাস্টার ছেঁড়ে ছিটকে পড়ছে, পানির ট্যাংকেও বড় ফাটল দেখা গেছে এবং ব্যবহারিকভাবে বিপজ্জনক অবস্থায় বিদ্যুতের লাইন ও সুইচ বোর্ড রয়েছে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, কাজের শুরু থেকেই ঠিকাদারের লোকজন নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার করেছিলেন এবং ইঞ্জিনিয়ারদের পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় অনিয়ম ঘটেছে। রামডাকুয়া গ্রামের মো. রমজান আলী (৪৫) বলেন, “আমার ছেলে ক্লাস ওয়ানে পড়ে। র‍্যাম্প দিয়ে উপরে উঠতে গিয়ে ফাটা দেখলাম—ভয়ে ভয়ে উপরে উঠেছিলাম। পরে দেখলাম র‍্যাম্পের মুখে তালা দেয়া আছে। সিঁড়ি-সড়ক ভাঙা—এতে কোনো দুর্ঘটনা হলে কে দায় নিবে?”

নিয়ন্ত্রণসহ আশপাশের মানুষজনও চিন্তায় আছেন। বাড়ি পাশে থাকা মো. খলিলুর রহমান বলেন, “বিল্ডিংটা করতে তিন মাসও হয়নি, তাতে এত ফাটল—আর বন্যা এলে নিচতলা মানুষ ও গবাদিপশুর আশ্রয় হবে। ভাবলে কাঁপ্লাম।”

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) জানায়, কাজটি পেয়েছিল রংপুরের মেসার্স তাহিতি অ্যান্ড জেডএইচডি (জেবি) এবং বাস্তব কাজ করেছে সুন্দরগঞ্জের পলাশ এন্টারপ্রাইজ। কাজ শুরু হয়েছিল ২০২১ সালের ২০ ডিসেম্বর; প্রকল্পটি ২০২৩ সালের ১৯ জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজ শেষ হয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তফসিরা চৌধুরী জানিয়েছেন, হস্তান্তরের আগেই ফাটল ছিল—তিনি একাধিকবার ইঞ্জিনিয়ার অফিস ও ঠিকাদারকে জানিয়েছিলেন, কিন্তু যথাযথ অনুসরণ হয়নি। বেলকা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাওলানা মো. ইব্রাহীম খলিলুল্লাহও বলেছেন, কাজ চলাকালে তিনি অনিয়ম দেখেছেন এবং এলজিইডি অফিসকে জানিয়েছিলেন, এরপরেও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পলাশ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী প্রিতমকে খবর করতে গেলে তিনি নিউজ করা নিষেধ করেন। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ বলেন, বিষয়টি তিনি জানেন না—আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম, খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কাজটি তদারকির দায়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী কাজী মাহবুবুর রহমান মিলন বলেন, “এ ধরনের কাজে প্রায়ই হেয়ার ক্র্যাক (সূক্ষ্ম ফাটল) দেখা যায়। কিউরিং ঠিকমতো না হলে সমস্যা বাড়ে। তবে এটি ভয়মান পর্যায়ের নয়—খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় মেরামত করা হবে।”

উপজেলা প্রকৌশলী তপন কুমার চক্রবর্তী ফোনে কথা বলতে রাজি হননি; পরে অফিসে গিয়েও তিনি মন্তব্য করতে অনিচ্ছুক ছিলেন।

স্থানীয় শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা ভবনের নিরাপত্তা ও দ্রুত মেরামতের দাবি জানাচ্ছেন। তারা বলছেন—এটা শুধু একটি স্কুল নয়, বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হবে; তাই নির্মাণের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বড় ধরনের ক্ষতি ও ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যেন দ্রুত তদন্ত করে জরুরি সংস্কার করে জনসাধারণকে আশ্বস্ত করে, এটাই স্থানীয়দের আশা।

পোস্টটি শেয়ার করুন