মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটে সময়ে সৌরশক্তি হতে পারত সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও কার্যকর বিকল্প। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে দেশটির সৌরবিদ্যুৎ খাতটি নজিরবিহীন দুর্নীতি, জালিয়াতি ও সিন্ডিকেট ব্যবসার কারণে গতিহীন হয়ে পড়েছে।
তদন্তে জানা যায়, এই খাতে অনিয়মের পথ প্রশস্ত হয়েছিল ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’-এর মাধ্যমে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এড়িয়ে ‘ক্লিন এনার্জি’ শিরোনাম দিয়ে পছন্দনীয় ব্যক্তিদের কাজ দেওয়া হয়। ফলে বাজার মূল্য থেকে বহুগুণ বেশি দামে বিদ্যুৎ ক্রয়ের অসম চুক্তি—পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (পিপিএ)—করতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-র রিপোর্টে উল্লেখ আছে, আওয়ামী লীগ আমলে প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচ ছিল প্রায় ৮ কোটি টাকা। অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ছয় প্রকল্পে গড়ে প্রতি মেগাওয়াট খরচ এসেছে ১৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। টিআইবি এই চরম ব্যবধানকে গণ্য করে এই ছয় প্রকল্পেই প্রায় ২,৯২৬ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ এনেছে। অন্যদিকে পাঁচটি প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে জালিয়াতির দাবি করে প্রায় ২৪৯ কোটি টাকা হাতিয়ানোর কথাও বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে কৃষিজমি অকৃষি হিসেবে দেখানো, ভুয়া মৌজা দর ব্যবহারসহ নানা পর্যালোচনায় প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয়েছে।
খাতের অভ্যন্তরে এমন লুটপাট চালানোতে জড়িত ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট—এটাই সংশ্লিষ্টদের সামগ্রিক অভিযোগ।
এক্সিলন বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবতাহী ইসলাম শুভ বলেন, বিগত সরকারের সময় প্রতিমন্ত্রীর রেফারেন্স ছাড়া লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) পাওয়া সম্ভব ছিল না। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একটি সৌরপ্রকল্প শেষ করার নির্ধারিত সময় ১৮ মাস হলেও এলওআই পেতে ২–৩ বছর পর্যন্ত লেগে যেত। তিনি বলেন, ‘‘প্রায় ৩২টি ধাপ পার করে এলওআই অনুমোদন পাওয়ার অর্থ ছিল—কাজ শুরু করা নয়; পরবর্তী ধাপগুলো পার হয়ে পিপিএ সম্পাদন হলে তবেই প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার রীতি ছিল।’’
শুভ বলেন, এই দীর্ঘ সময়সীমা ও জটিলতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ নষ্ট করেছে। সময়ের সঙ্গে বাজারদর, আমদানি খরচ, ব্যাংক সুদের হার—all কিছুর পরিবর্তন হওয়ার কারণে অনেক দক্ষ প্রতিষ্ঠানই প্রকল্প থেকে সরে আসে। কিন্তু তৎকালীন অনুকুল পরিবেশ ও হ্যান্ডশেক ডিলের ফলে অদক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোও নির্বিঘ্নে কাজ পেয়েছে।
দেশের প্রথম সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প পাওয়া প্রতিষ্ঠান এইচডিএফসি সিন পাওয়ার লিমিটেডের স্থানীয় কর্ণধার ক্যাপ্টেন (অব.) এসকেএম শফিকুল ইসলামও আওয়ামী আমলের অনিয়ম স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘এ ধরনের পরিস্থিতি সৌরবিদ্যুৎ প্রসারের জন্য একেবারেই সহায়ক নয়।’’
জ্বালানি বিশ্লেষক প্রকৌশলী ফরিদ আহমেদ পাঠান উল্লেখ করেন, প্রতিবেশী দেশগুলো তখন তাদের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান উৎস হিসেবে সৌরশক্তিকে গড়ে তুলছিল; অথচ বিগত সরকার এ ক্ষেত্রটিকে লুটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। তিনি তুলনামূলক দামের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভারতে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম ছিল প্রায় ৩ সেন্ট, পাকিস্তানে ০.৩২ সেন্ট ও চীনে ০.৪৫ সেন্ট, অথচ বাংলাদেশে গড় দাম ছিল ১২ সেন্টের বেশি—প্রতিবেশী দেশের তুলনায় চারগুণ বা তারও বেশি। এই তথ্যই বলে দেয় কতটা মূল্যস্ফীতি ও অনিয়মের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ ক্রয় করা হয়েছে। পাঠান আলোকপাত করেন, এ ধরনের লুটপাট কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়—এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকেই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এছাড়া দেখা যায়, আওয়ামী আমলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কোনো সুসংগত নীতিমালা ছিল না। বিভিন্ন নথি ও নীতিমালায় ২০৫০ সালের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মিলেমিশে ও অগোছালো ধরণে টার্গেট নির্ধারণ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ—নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালায় ২০২৩ সালে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০%, ২০৪১ সালে ৩০% নির্ধারণ করা হয়েছিল; অথচ ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যানে (আইইপিএমপি) ২০৩০ সালে ১০% ও ২০২৫ সালে ৪০% নির্ধারণ ছিল। জলবায়ু সমৃদ্ধ পরিকল্পনায় (২০২২) বলা হয় ২০৩০ সালে ৩০%, ২০৪১ সালে ৪০% ও ২০৫০ সালে ১০০% নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করা হবে—এভাবে ভিন্ন নথিতে ভিন্ন লক্ষ্য থাকায় নীতির ধারাবাহিকতা ও বাস্তবায়ন বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট স্পষ্ট করে দিয়েছে নিজস্ব ও নবায়নযোগ্য উৎসের গুরুত্ব। যদি তখনকার সরকারের সময় সৌরবিদ্যুৎ খাতটিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে গড়ে তোলা হত, হয়তো আজকার মতো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে এতটা দুশ্চিন্তার সম্মুখীন হতে হতো না। সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে এখন দ্রুত স্বচ্ছতা, কঠোর নিয়ম ও যুগোপযোগী নীতিমালা নিয়ে কাজে নামতে হবে—নাহলে দেশের অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তিই ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।