দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কক্সবাজারের মহেশখালীতে দেশের প্রথম মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের মূল কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। রোববার (৩ মে) থেকে বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো—জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণের বড় কাজ মাঠপর্যায়ে শুরু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম। তিনি বলেন, ঠিকাদার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সই হওয়ার এক বছর পরে কাজ শুরু হওয়া প্রকল্পের জন্য এক বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত এই মেগা প্রকল্পের প্রথম প্যাকেজের কাজটি করছে জাপানের দুই প্রতিষ্ঠান পেন্টা ওশান এবং টোয়া কর্পোরেশন। এই প্যাকেজের বরাদ্দকৃত খরচ প্রায় ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা; এর মধ্যেই বন্দরের প্রধান জেটি ও টার্মিনালসহ আনুষঙ্গিক কাঠামো নির্মাণ করা হবে। যদিও গত বছরের এপ্রিলে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তৎপরতার পরপরই কারিগরি প্রস্তুতি ও মালামাল সংগ্রহের কাজ চলার কারণে মাঠপর্যায়ে প্রকৃত কাজ কিছুটা পরে শুরু হতে দেখা গেছে।
নির্মাণকাজের প্রাথমিক ধাপে জাপান থেকে আনা একটি বিশেষায়িত বিশালাকার ড্রেজার দিয়ে ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। সূত্রে জানা যায়, এই প্রক্রিয়ায় সমুদ্র থেকে প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুটেরও বেশি মাটি-বালি উত্তোলন করা হবে; উত্তোলিত উপকরণ দিয়ে প্রকল্প এলাকা ভরাট করা হবে এবং ভবিষ্যতের সম্প্রসারণের জন্য মাটি সংরক্ষণ করা হবে।
প্রকল্পের এ প্যাকেজের আওতায় আগামী চার বছরের মধ্যে ৪৬০ মিটার লম্বা একটি আধুনিক কন্টেইনার জেটি এবং ৩০০ মিটার লম্বা একটি মাল্টিপারপাস জেটি নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি বন্দরের কার্যক্রম সমর্থন করার জন্য ব্যাকইয়ার্ড অর্থাৎ কনটেইনার স্ট্যাকিং, যানবাহন ও লজিস্টিক সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক অবকাঠামোও গড়ে তোলা হবে।
মহেশখালীর প্রায় ১ হাজার ৩০ একর জায়গাজুড়ে এই মাতারবাড়ি বন্দর নির্মাণ প্রকল্পের মোট আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪,৩৮১ কোটি টাকা। কর্তৃপক্ষ জানান, বন্দরটি চালু হলে বড়াকার মাদার ভেসেল বা গভীরসমুদ্রজাত জাহাজ সরাসরি এখানে বন্দর করতে পারবে, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ধরনেই পরিবর্তন আনবে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী জেটি ও টার্মিনালের নির্মাণকাজ ২০২৯ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে এবং সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০৩০ সাল থেকে বন্দরটি বাণিজ্যিকভাবে কার্যক্রম শুরু করবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বন্দরটি চালু হলে বছরে অন্তত ১১ লাখ টিইইউএস কনটেইনার অপারেশন করতে সক্ষম হবে; দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০৪১ সালের মধ্যে এই হ্যান্ডলিং ক্ষমতা ২৬ লাখ টিইইউএস পর্যন্ত উন্নীত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
নির্মাণকাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সংস্কৃতি-অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। কর্মকর্তারা বলছেন, মাতারবাড়ি বন্দর দেশটির সমুদ্র অর্থনীতি শক্তিশালী করবে ও দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও মজবুত করবে।