সোমবার, ৪ঠা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রক্তাক্ত সড়ক: একদিনে ঝরে গেল ১২ প্রাণ

একই দিনে দেশের বিভিন্ন পথে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ১২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। সবশেষ সিলেটে তেলিবাজারে পাশবহনকারী ট্রাক ও একটি পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে আটজন নিহত হয়েছেন; আহত হয়েছেন অন্তত ১২ জণ। ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোদের মধ্যে ছিলেন এক স্বামী—যার সঙ্গে স্ত্রী একসঙ্গে কাজে যাচ্ছিলেন—এবং আহত স্ত্রী এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

দম্পতি দুজন সকালে চার শিশুকে ঘরে রেখে কর্মস্থলের উদ্দেশে বের হন। পথে পিকআপে করে যাওয়ার সময় তেলিবাজার এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা কাঠ বোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলে অনেকেই ছিটকে পড়েন; পরে হাসপাতালে নিলে হাসপাতালে পৌঁছানোর পরই ওই স্বামীর মৃত্যু নিশ্চিত হয়। স্ত্রী এখনো আঘাতজনিত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং শোনা যায়নি যে তিনি নিজে জানেন কী না যে তার স্বামী মারা গেছেন। তাদের চার সন্তান হতবাক, নির্বাক হয়ে পড়েছে।

পিকআপে প্রায় ২০ জন ছিলেন; তারা সিলেটের আম্বরখানা থেকে একটি ভবনে ঢালাইয়ের কাজের জন্য যাচ্ছিলেন। পিকআপে ঢালাই মেশিনও ছিল। নিহতদের মধ্যে স্থানীয় নামগুলো হলো—সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার সরিষা গ্রামের নার্গিস (৪৫), দিরাইয়ের সেচনী গ্রামের মুন্নি বেগম (৩৫), দিরাইয়ের ভাটিপাড়া গ্রামের নুরুজ আলী (৬০), ভাটিপাড়া নুর নগরের ফরিদুল (৩৫), বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিখলা গ্রামের দুই ভাই আজির উদ্দিন (৩৫) ও আমির উদ্দিন (২২), সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের শিবপুর গ্রামের পাণ্ডব বিশ্বাস (২০) ও পুটামারা গ্রামের বদরুজ্জামান (৪৫)। আহতদের মধ্যে কেউ কেউ বর্তমানে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসাধীন।

বদরুজ্জামানের স্ত্রী হাফিজা বেগমও আহত এবং বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। জ্ঞান ফেরার পর তিনি জানান, দুর্ঘটনার সময় মাথায় আঘাত পেয়েছেন; পরে কিছুই মনে নেই। হাসপাতালে তার চার সন্তান শয্যার পাশে বসে ছিল। বদরুজ্জামানের মরদেহসহ নিহতদের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা আছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের আত্মীয়রা বলছেন, বদরুজ্জামান চার সন্তানের পিতা; এখন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারসহ আত্মীয়স্বজন উদ্বিগ্ন।

সিলেটে নিহত দুই ভাইয়ের মরদেহ শনাক্ত করেছেন তাদের খালাতো ভাই শামীম আহমদ। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুর্ঘটনার খবর দেখে সন্দেহজনক মনে করে হাসপাতালে এসে মরদেহ শনাক্ত করেন।

একই দিনে দেশের অন্য প্রান্তে আরও several মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। নোয়াখালীর সুবর্ণচরে দুপুরে মায়ের সামনে ড্রামট্রাকের চাকায় চাপা পড়ে মো. ইয়ামিন (৮) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। পুলিশ ট্রাকটি জব্দ করে এবং মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

কুমিল্লার দেবিদ্বারেও ভাঙাচোরা সড়কের জের—বাবার মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে পিছন থেকে আসা একটি কাভার্ডভ্যানের চাকায় পিষ্ট হয়ে মু. খালিদ হোসেন (৮) নামে এক মাদরাসা শিক্ষার্থী নিহত হন। স্থানীয়রা জানায়, ঘটনার পর তারা শিশুর দগ্ধ দেহ বাড়ি নিয়ে গেছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল-আড্ড সড়কের বেনিপুর মোড়ে একটি ট্রাক ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে শ্যালক ও দুলাভাই—সোহাগ (১৭) ও রবিউল আউয়াল (২২)—ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দু’জনকে মৃত ঘোষণা করেন।

একই দিনে এই সব পৃথক দুর্ঘটনায় মোট ১২ জনের প্রাণহানি দেশের সড়ক দুর্ঘটনার ধারাবাহিকতা আর বাড়িয়ে তুললো। প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহত পরিবারের স্বজনেরা বলেন, অপ্রতিবদ্ধ ও অনিয়ন্ত্রিত যানচলন, দ্রুতগতির যানবাহন ও অনিয়মই এমন ঘটনার মূল কারণ। দুর্ঘটনায় ব্যবহৃত ট্রাক-ভ্যান জব্দ করা হয়েছে এবং পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে।

রিপোর্টটি তৈরিতে সিলেট, নোয়াখালী, দেবিদ্বার (কুমিল্লা) ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংবাদ প্রতিনিধিরা তথ্য দিয়েছেন।

পোস্টটি শেয়ার করুন