শুক্রবার, ২৯শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কোরবানির ঈদে অভ্যন্তরীণ বাজারে সাড়ে তিন লাখ থেকে চার লাখ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা

পবিত্র ঈদুল আজহার সময় বাংলাদেশে কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানই নয়, বরং বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও জেগে ওঠে। নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতাদের প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৬ সালে কোরবানির পশুকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কোটি থেকে চার লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য ঘটার সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির বক্তব্যে বলা হয়েছে, কোরবানির ঈদ দেশের অন্যতম বড় মৌসুমি বাজার হিসেবে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই কার্যক্রমের বড় অংশ সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে পৌঁছে, যা লক্ষাধিক ক্ষুদ্র খামারি ও কৃষকের প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত হয়।

এই অর্থনৈতিক চক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গবাদিপশুর বাজার। সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান দেখায় এবার দেশে প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে, যেখানে সম্ভাব্য চাহিদা প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ। যদি প্রতিটি পশুর গড় বিক্রয়মূল্য ৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা ধরা হয়, তাহলে শুধুমাত্র পশু কেনাবেচায় এক লাখ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পশু-বাজারের ধাক্কায় পশুখাদ্য, ভ্যাকসিন ও ঔষধ, খামার সরঞ্জাম-পূর্তির ব্যবসাও তুঙ্গে চলে। এছাড়া পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মাংস সংরক্ষণ ও পরিবহনের কারণে রেফ্রিজারেটর ও ডিপ ফ্রিজের চাহিদা বাড়েছে—ফলত ইলেকট্রনিক্স ক্ষেত্রেও কিস্তি ও বিশেষ অফারের প্রচলন দেখা যাচ্ছে।

ফ্যাশন ও ভোগব্যবসাও ঈদের সময় হেভি হয়ে ওঠে। পোশাক, কসমেটিকস ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য পণ্যে এক ঈদেই আনুমানিক ৮০ হাজার কোটি থেকে এক লাখ কোটি টাকার লেনদেন হতে পারে বলে ধারণা। দেশজুড়ে পশু পরিবহনের জন্য হাজার হাজার ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ঢাকার দিকে রওনা হয়, যা চালক ও শ্রমিকদের জন্য অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ এনে দেয়। ভৌগোলিকভাবে দেশের মোট ঈদ বাণিজ্যের প্রায় ৩০–৩৫ শতাংশ ঢাকায় সম্পন্ন হয়; বিশ্লেষকদের মতে ঢাকার অংশ আনুমানিক এক লাখ কোটি থেকে এক লাখ বিশ হাজার কোটি টাকার মধ্যে দাঁড়াতে পারে।

ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খাতগুলো এই মৌসুমে বিশেষভাবে সক্রিয় হয়—দা, চাপাতি, ছুরি, বঁটি, চাটাই তৈরির কারিগররা বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করেন। যদিও এসব ক্ষুদ্র ব্যবসা জাতীয় পরিসরে বড় করে দেখা না গেলেও বাস্তবে হাজার হাজার নিম্ন আয়ের মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস হয়ে থাকে। একই সঙ্গে ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার কোরবানির সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়েছে; অনলাইন পশুর হাট ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের ব্যবহার লেনদেনকে আরও সংগঠিত ও আনুষ্ঠানিক করেছে।

তবে সবকিছু উৎসাহজনক নয়—চামড়া শিল্প এখন কিছুটা মলিন অবস্থায় রয়েছে। সংরক্ষণ ও ট্যানারির আন্তর্জাতিক মানের ঘাটতির কারণে খাতে কাঙ্ক্ষিত রপ্তানি সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক সংস্কার, আধুনিক সরবরাহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে চামড়া শিল্প ভবিষ্যতে দেশের রপ্তানি আয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

সার্বিকভাবে ঈদুল আজহার চারপাশে গড়ে ওঠা এই সমন্বিত অর্থনৈতিক প্রবাহ গ্রামীণ আয় বাড়ায়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সক্রিয় করে, মৌসুমি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং দেশের অর্থনীতিকে শক্ত করার সুযোগ করে দেয়। সরকারি নীতি ও বেসরকারি উদ্যোগ মিলিয়ে অবকাঠামো ও সেবা উন্নত করা হলে এই সম্ভাব্য লাভকে আরও টেকসই ও লাভজনকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন