মঙ্গলবার, ২রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে দরকষাকষায় আটকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনা

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনা ‘সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম’ সংক্রান্ত দরকষাকষার কারণে অচলাবস্থায় পড়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কীভাবে পরিচালনা করা হবে—এই ইস্যুতে একে অপরের সঙ্গে সম্মত থাকতে পারছে না, ফলে আলোচনার গতিবিধি স্থবির। তিনি ওয়াশিংটনের পাঠানো ‘পরস্পরবিরোধী বার্তা’কে আলোচনাকে জটিল করার দায়ী করেছেন।

তেহরান সন্দেহ প্রকাশ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই আন্তরিকভাবে আলোচনায় বসছে কিনা। আরাগচি জানিয়েছেন, ইরান স্থানান্তর সংক্রান্ত প্রস্তাব নিয়ে রুশ প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ করেছে। একই সময়ে চীনও দুই দেশের মধ্যে আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে; চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, বেইজিং বিশ্বাস করে হরমুজ প্রণালী সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতি অর্জনের মধ্য দিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা কমানো সম্ভব।

এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, যদি ইরান ২০ বছরের জন্য তার পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করে, তিনি তা গ্রহণের প্রস্তুত আছেন। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ ফোনে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং দুজনেই একমত হয়েছেন—ইরানকে এখনই আলোচনায় বসতে হবে এবং তাকে পারমাণবিক অস্ত্রাধারী হতে দেয়া যাবেনা; এছাড়া তারা ইরানকে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ারও কথা বলেছেন।

তেহরান বলছে, হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা রক্ষায় ইরানের ঐতিহাসিক ভূমিকা অব্যাহত থাকবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে আলাপকালে জানান, ইরানের মিত্ররা বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেহরানের ওপর নির্ভর করতে পারে।

ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে এক সাংবাদিককে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন এবং তাকে ‘ভুয়া’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, ওই সাংবাদিকের লেখা ‘রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য’। তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক সফলতা অর্জন করেছে এবং সেটি স্বীকার করে—শুধু কিছু লোক ছাড়া যারা সত্য লিখে না। এ মন্তব্য তিনি চীন সফর শেষে এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সামনে করেছেন।

এই সব কূটনৈতিক উত্তেজনার পেছনে জ্বালানি নিরাপত্তার রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বও স্পষ্ট। মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট বলেছেন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে পাইপলাইন সক্ষমতা বাড়ানোর প্রত্যাশা রয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস পরিবহনে হরমুজ প্রণালীর প্রভাব কমাতে সাহায্য করবে। তিনি যোগ করেছেন, যদিও হরমুজের গুরুত্ব কমতে পারে, ওই অঞ্চলের জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহের গুরুত্ব অটল থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্র চায় তার মিত্ররা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে শীর্ষস্থানীয় ভূমিকা বজায় রাখুক।

কূটনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি সামরিক সহিংসতাও বাড়ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, তারা ইরানের কিছু সামরিক লক্ষ্যবসতে ‘আত্মরক্ষামূলক’ অভিযানে হামলা করেছে—গোড়ুক শহর ও কেশম দ্বীপে অবস্থিত রাডার ও ড্রোন স্থাপনায় এ হামলা চালানো হয়। সেন্টকম বলেছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি এমকিউ-১ ড্রোন ভূপাতিত করার জবাবে অভিযানে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন এবং দুটি একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে, যেগুলো আঞ্চলিক জাহাজগুলোর জন্য ‘স্পষ্ট হুমকি’ তৈরি করছিল।

ইরানি সরকারের পক্ষ থেকে এ সময় কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এসব ঘটনার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে এবং কূটনৈতিক পথ খোলা না থাকলে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়বে। আনত কোনো সমাধান না আসা পর্যন্ত পরিস্থিতি নীরব অবস্হায় নেই—বরং দরকষাকষা, সন্দেহ ও সামরিক কূটনীতির জটিল সমন্বয়ে চলবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন