বুধবার, ১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাঁটাতারের বেড়াজালে মানবতার সংকট

ভাই, আমার সন্তানের জন্য একটু পানি দেন, আমি টাকা দিচ্ছি! — পঞ্চগড়ের হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি সীমান্তের শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে এক বাবার এই আকুল আর্তনাদ পাঠানো হয়েছে। এই খবর শুধু সীমান্তরক্ষীদের নয়, মানুষের বিবেককেও কাঁপিয়ে দিয়েছে দুই দেশের সীমান্ত লাগোয়া চারপাশের মানুষজনের মাঝে গভীর মানবিক সংকটের বিষয়ে সাম্প্রতিক এক দৃশ্যপট। তবে আইনি জটিলতা এবং কূটনৈতিক কাঁটাতার মোড়াকে এড়িয়ে যেতে না পেরে, এই বাবা যেন ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলেছেন, কিন্তু কেউই তাঁকে সান্ত্বনা বা সহায়তা দিতে পারেননি। এই ঘটনাটি এখন শুধুই ব্যক্তিগত নয়, এটি এখন এক গভীর মানবিক ও কূটনৈতিক সংকটের চিত্র।

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক যখন নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, সেই সময়ই নজরে এসেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের জোরপূর্বক অনুপ্রবেশের অব্যাহত চেষ্টাগুলো। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত সব সীমান্ত জুড়ে এখন এক ভয়াবহ পুশইনের আতঙ্ক। অসহায় মানুষজন খোলা আকাশের নিচে, পরিচয়বিহীন, রাষ্ট্রহীন অবস্থায় জীবনযাপন করছে। তীব্র দাবদাহে আর বর্ষণের মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা এই মানবেতর জীবনযাপন করছে, যা শুধুই একটি সীমান্ত সমস্যা নয়, বরং মানবিক ও কূটনৈতিক বিপর্যয়ের সূচনা।

এক রাতে খুলে গেল আটটি পয়েন্ট: জামালপুর ও কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন সীমান্তে একযোগে শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টার বিবরণ বিজিবির কাছ থেকে পাওয়া গেছে। বিস্তারিত বিবরণে জানা গেছে:
— খেয়ারচর বিওপি: ১০৬৯ নম্বর পিলারের বিপরীতে ভারতের সদরটিলা এলাকা দিয়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জনকে পুশে পাঠানোর চেষ্টা।
— পাথরেরচর বিওপি: ১০৭৫ নম্বর পিলারের বিপরীতে লুকায়েরচর এলাকা থেকে ১৮-২০ জনের একটি দল।
— ইজলামারি বিওপি: ১০৬৭ নম্বর পিলারের কাছে মানকারচর থেকে ১২-১৩ জন।
— মোল্লারচর সীমান্ত: ১০৬২ নম্বর পিলারের ভিতর কুচুনিমারা এলাকা থেকে ১০-১২ জন।
— দাঁতভাঙা বিওপি: ১০৫৪ নম্বর পিলারের বিপরীতে দীপচর এলাকা থেকে ৮-১০ জন।
— ঝাউডাঙা বিওপি: ১০৭৮ নম্বর পিলার থেকে দুর্গাপাড়া এলাকা দিয়ে ৮-১০ জন।
— বাঘারচর বিওপি: ১০৭৩ নম্বর পিলার থেকে বালুরঘাট ও কুমারেরচর দিয়ে ৭-৮ জন।
— সাতানীপাড়া বিওপি: ১০৮৭ নম্বর পিলার থেকে বিলডুবার এলাকার চেষ্টা।

অন্ধকারে বিভ্রান্তির মধ্য দিয়ে চলা এই অপকর্মের জন্য সোমবার রাতের একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সীমান্তে কুমারেরচর এলাকায় বিএসएफ তাদের সব আলো বন্ধ করে দেয়। রাতের আঁধারে এই কৌশল বোঝার চেষ্টা করেন বিজিবির কর্মকর্তারা। এর কিছুক্ষণ পরেই বিএসএফ ১৮ জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য চেষ্টা চালায়। তবে বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসীর কঠিন প্রতিরোধে সেই রাতের অপারেশন ব্যর্থ হয়ে যায়। এর আগেও রোববার রাতে বড়াইবাড়ী সীমান্ত দিয়ে ৮ জনকে পাঠানোর চেষ্টা চলেছিল, যা আবারো বাধার মুখে পড়ে।

জামালপুরের ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, ‘সীমান্ত পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে উদ্বেগজনক। আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছি। সীমান্তের ৭২ কিলোমিটারে ১৫টি বিওপির সদস্যরা দিনরাত টহল দিচ্ছেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতে গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।’

সীমান্তে এই পরিস্থিতির ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষোভ দানা বাঁধানো শুরু হয়েছে। তারা বিজিবির পাশাপাশি নিজ নিজ অংশীদার ও স্থানীয় নেতা-জনপ্রতিনিধির সঙ্গে হাত মিলিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন। সোমবার রাতে সীমান্ত এলাকায় পুশ-ইনের খবর ছড়িয়ে পড়লে গ্রামবাসীরা লাঠিসোটা নিয়ে উপস্থিত হন, রাতে পাহারা দেন এবং অবিরাম সতর্ক থাকেন। একজন স্থানীর ভাষ্য, ‘ভারতের কেউ যেন আমাদের দেশে প্রবেশ করতে না পারে, তার জন্য আমরা সবাই আছি। আমাদের দল বেঁধে পাহারা দিচ্ছি।’

পঞ্চগড়ের বড়বাড়ি সীমান্তে পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। সেখানে প্রায় ৩৮ ঘণ্টা ধরে ১০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু শূন্যরেখায় আটকে আছে। তারা সব বয়সের এবং মধ্যবয়সী নারী ও শিশু রয়েছে। বর্ষার বৃষ্টিতে তারা পুরো নগরীত ভিজে গেছে, মাথার ওপরে কোনো ছাদ নেই, পায়ের নিচে কর্দমাক্ত মাটি। বিশুদ্ধ পানির অভাবে দিশেহারা শিশুরা পানি ও নোংরা পানিতে কবুল করতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। এই ক্ষুদে শিশুরা কেবল বৃষ্টি দেখে কাঁদছে, অভাবের অন্ধকারে পড়ে গেছে। তাদের বোঝার বা স্বজনদের কাছ থেকে কিছু চাওয়ার ক্ষমতা নেই, তারা শুধু এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানির জন্য কাঁদছে।

নওগাঁ ও সীমান্তের অবস্থা: বছর জুড়েই সীমান্তের সমস্যায় তুমুল আলোচনা চলে। কখনও হয়রানি, কখনও হত্যা, আবার কখনও কৃষকের ওপর বিএসএফের শারীরিক ও মানসিক চাপ—জীবন যেন চিরকালই অনিশ্চয়তায় ভরা। সম্প্রতি নওগাঁ সীমান্তে আবারও পুশইনের ঘটনা বেড়ে গেছে, ফলে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি কঠোর তৎপরতা চালাচ্ছে।

নওগাঁতে নয়টি সীমান্ত রয়েছে, বিশেষ করে সাপাহার উপজেলার হাঁপানিয়া ও করমুডাঙ্গা, পোরশা উপজেলার নিতপুর, ধামইরহাট উপজেলার কালুপাড়া, চকিলাম, চকচণ্ডি, বস্তাবর, শিমুলতলী ও তালান্দা। এসব সীমান্তে সব থেকে বেশি হয়রানি ও হত্যার শিকার হয়। কৃষকরা মাঠে ফসল ফলানোর সময় বা গভীর রাতে বিএসএফের আচরণে ক্ষুব্ধ। সুলতান নামের একজন বলেন, ‘আমাদের মরুভূমির মতো জীবন, চাষ ছাড়া কিছুই করিনি, অথচ বিএসএফ নিয়মিত হয়রানি করে। সাবধান করে দেয়, ভয় দেখায়—এমনকি ধাওয়া দেয়। তাহলেও আমরা মর্যাদার সঙ্গে কাজ চালাচ্ছি। ’

আরেক গ্রামবাসী জানান, ‘পুশইনের আতঙ্ক এখন সাধারণ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিজিবি শক্ত হাতে কাজ করছে, কিন্তু আমাদের মনোভাব এখনও ভরসা পাচ্ছে না। ’

পশ্চিমবঙ্গের হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন গড়ে শতাধিক মানুষ পালানোর জন্য জড়ো হচ্ছেন। ঢাকা ও দিল্লির যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নাগরিকত্বের স্বীকৃতি মিললে ধাপে ধাপে হস্তান্তর হবে মানুষ।

নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ কঠোর, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানাচ্ছে যে, তারা পুশইনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিচ্ছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ঘোষণা করেছেন, ‘বাংলাদেশ যেকোনো অবৈধ পুশইনের বিরুদ্ধে নীরব থাকবে না। ইতোমধ্যে আমরা ভারতকে ১২-১৩টি চিঠি দিয়েছি। আমাদের আইন-শৃঙ্খলার স্বার্থে এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে দেখা উচিত, আর ভারত যদি এই বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেয়, তবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য সমস্যা তৈরি হবে।’

অপরদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, ‘আমরা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও আইনের ভিত্তিতে অবৈধ নাগরিকPerfil র ফিরে পাঠাচ্ছি। বাংলাদেশের কাছে একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে, এবং দ্রুত পরিচয় শনাক্তের অনুরোধ জানানো হয়েছে।’ পশ্চিমবঙ্গের হাকিমপুর সীমান্তে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ জড়ো হয়ে থাকছে—ধাপে ধাপে নাগরিকত্ব সনাক্তের পরই তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে বলে ভারত দাবি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে এই পুশইণের অব্যাহত প্রচেষ্টা কেবল ব্যক্তিগত বা সরঞ্জাম বিষয় নয়, তা গভীরভাবে রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত। উল্লেখ করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক এয়ার ফোর্স কর্মকর্তা ইশফাক ইলাহী চৌধুরী, ‘পুশইন শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়। এটা মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা, যেখানে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি আর আইনশৃঙ্খলা থাকা সত্ত্বেও রাতের আঁধারে মানুষ ঠেলে দেওয়াটা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক ক্ষতি করে। ’ অন্যএক সাবেক কূটনীতিক বলেছেন, ‘भारत যদি একতরফা এই পুশ-ইনের পথ অব্যাহত রাখে, তবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা বা মানবাধিকার সংস্থার সাহায্য নেবে। ’

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিষয়গুলি কেবল সীমান্তের সমস্যা নয়; এটি এখন এক ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সরগরম ও শক্তি খেলার অংশ। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের উপর। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নাগরিক পরিচয় যাচাই নীতির প্রভাবে এই সংকট আরও প্রকট হচ্ছে।

এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন যশোর, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, গাঙচড় ও নওগাঁ প্রতিনিধিরা।

পোস্টটি শেয়ার করুন