বুধবার, ১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সোনাগাজীতে ৬৫ একরে দেশি-বিদেশি ১০২ জাতের আমের বাগান

ফেনীর সোনাগাজীর মুহুরী সেচ প্রকল্প সংলগ্ন ৬৫ একর এলাকায় গড়ে উঠেছে এক অদ্ভুত আমের বাগান — সোয়াস এগ্রো কমপ্লেক্স। এখানে একসঙ্গে চাষ হচ্ছে প্রায় ১০২ জাতের আম; গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন স্বাদের ফল।

এই বাগানটির উদ্যোক্তা মেজর (অব.) মো. সোলায়মান। ১৯৮৬ সালে সেনা থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি বিদেশ যাওয়ার পথে না হেঁটে কৃষিকেই বেছে নেন। ১৯৯২ সালে মাত্র ৬ একর জমি এবং তিন লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে তিনি খামার শুরু করেন। ধীরে ধীরে পরিণতি হিসেবে তা এখন ৬৫ একরের সমন্বিত কৃষি প্রকল্পে পরিণত হয়েছে; খামারে রয়েছে প্রায় ৬ হাজার আমগাছ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, নওগাঁর বিখ্যাত দেশি জাতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভারত, ভুটান ও চীনের আমের জাতও আনা হয়েছে এখানে।

মেজর (অব.) সোলায়মান জানান, ‘‘এ বাগানে শুধু মৌসুমে নয়, বছরে ১২ মাসই কোনো না কোনো জাতের আম পাওয়া যায়। চলতি মৌসুমে আমাদের লক্ষ্য প্রায় ৯০–১০০ টন আম উৎপাদন।’’

বিক্রির দিক থেকে খামারটি বেশ স্বনির্ভর। সাধারণ জাতের আম বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৮০–১০০ টাকায়, আর কিছু বিশেষ জাতের দাম থাকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। আশ্চর্যের বিষয়, ক্রেতারা বাজারে না গিয়ে সরাসরি খামারে এসে আম কিনে নেয়; দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আম পৌঁছে দিতে কুরিয়ার সার্ভিস ও মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করা হচ্ছে।

খামারে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না বলে উদ্যোক্তা জানান। বছরে মাত্র একবার, মুকুল ফোটার আগে প্রয়োজন অনুযায়ী কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়; বাকী সময় জৈব সার ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে খামার চালানো হয়। ফলন ও মান বজায় রাখতে ব্যাগিং পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়। স্থায়ী কর্মচারীর সংখ্যা ২৫ জন এবং দৈনিক ভিত্তিতে আরও ১০ জন কাজ করেন।

খামারের ম্যানেজার ও সাবেক সেনা সদস্য হেলাল হোসেন বলেন, ‘‘সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে চাষ হওয়ায় ফরমালিনমুক্ত আমের চাহিদা খুবই বেশি। এখন খামার থেকেই প্রতিদিন গড়ে ৮০–১০০ কেজি আম বিক্রি হচ্ছে।’’

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে নিয়মিত আসা ক্রেতা নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘‘এখানকার আম সুস্বাদু ও নিরাপদ—ভেজাল মুক্ত। সন্তানদের জন্য নিশ্চিন্তে কিনি, তাই বারবার আসি।’’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় খামারে প্রদর্শনী প্লট তৈরি করা হয়েছে। উপপরিচালক মো. আতিক উল্যাহ জানান, এ মৌসুমে দফায় দফায় কাজ করে ১০০ টনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।

মেজর (অব.) সোলায়মান মনে করেন, তরুণরাও বিদেশে না গিয়ে নিজ দেশে কৃষি করে স্বাবলম্বী হতে পারে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে কর্মীদের সঙ্গে মাঠে কাজ করেন এবং বলেন, নিজের পরিশ্রমই তাকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রেখেছে।

১০২ জাতের এই বাগান শুধু একজন উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প নয় — এটি দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণা, যেখানে সঠিক পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও ধৈর্যের মাধ্যমে কৃষিকেই বানানো যায় লাভের পথ।

পোস্টটি শেয়ার করুন