শনিবার, ১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অর্থনীতির ক্ষত সারাতে নতুন উদ্যোগের ঘোষণা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মোট বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ এই শ্লোগানে এ বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো ক্ষতগ্রস্ত অর্থনীতিকে সুস্থ ও ধারাবাহিকভাবে উন্নত করা। এটি দেশের ৫৫তম বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি তার প্রথম বাজেট উপস্থাপন।

প্রচণ্ড উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব জোগান কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়ে এই বাজেটে আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য ফেরানোর জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাজেটের মূল দর্শন হলো অর্থনীতির ক্ষত গুলোকে চিহ্নিত করে কার্যকরভাবে তা থেকে উত্তরণ ঘটানো।

বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে দুর্বলতা একটি বড় সমস্যা। কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে ৮ শতাংশের নিচে থাকায় রাষ্ট্রের আয় কমে গেছে। এই দুর্বলতা কাটাতে এবারের বাজেটে করের জালে বিস্তার ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেমন অনলাইন কর রিটার্ন, ডেটা ইন্টিগ্রেশন প্রভৃতি।

অন্যদিকে, দেশের ঋণের বোঝাও মারাত্মক আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত বছরগুলোতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদে প্রচুর অর্থ খরচ হয়, যার ফলে বাজেটের বেশ বড় অংশ সুদ পরিশোধে চলে যায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শুধুমাত্র সুদে ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৭.৫ শতাংশে নামানোর। জনজীবনে স্বস্তি আনার জন্য বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প চালু হবে, যেমন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, এবং ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’।

অর্থনীতির বৃহৎ সমস্যা সমাধানে সরকারের প্রস্তুত রয়েছে বিশাল বাজেট। ঘাটতি পূরণের জন্য বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ আবেদন করা হচ্ছে। বিদেশ থেকে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা, ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে আরও ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

নির্মাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক প্যাঁচা লাগানো হয়েছে। শিক্ষা খাতে একলাফে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা, যেখানে শিগগিরই স্বল্পমেয়াদে ও দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষা সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শেখানোর জন্য নতুন কর্মসূচি ঘোষণা হয়েছে। নারীদের জন্য স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা থাকছে।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণের কাছাকাছি বাড়ানো হয়েছে, যা দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করবে। দেশের বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের ঘোষণা এই বাজেটে এসেছে। এককথায়, দীর্ঘদিনের অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ঝুঁকি কমাতে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে দেশের সরকার।

তামাক ও সুগন্ধি পণ্যের উপর কর বাড়ানো হয়েছে, যাতে পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য উন্নত হয়। ভ্যাটের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে, যেন ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য কর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হয়। আবার, উচ্চ মূল্যের মাছ ও সুগন্ধি বৃক্ষের আমদানির উপরও নতুন শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা।

বাজেটের চূড়ান্ত পর্বে অর্থমন্ত্রী বলেন, এই বাজেট কেবল সরকারের হিসাব নয়, এটি দেশের সাধারন মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ, স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি তৈরি করবে। বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের বিস্তারিত পরিমাণতেও ঝোঁক দেওয়া হয়েছে। সামাজিক অবকাঠামো, সাধারণ সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, পানিসম্পদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা—সব খাতে বড় অংকের বরাদ্দের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈচিত্র্য আনতে কাজ করে যাবে এই বাজেট।

পোস্টটি শেয়ার করুন