বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটকে “বড় হলেও বাস্তবায়নযোগ্য” বলে অভিহিত করেছে ব্যবসায়ীর শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। শনিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, বাজেট সফল করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত দূরদর্শিতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা।
সংগঠনটি মনে করে, দেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দিকে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে বাজেটের পরিধি মোটেই অপ্রাসঙ্গিক নয়। তবু ইতিহাসের এই সর্বোচ্চ বাজেট সুচারুভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে শুরু থেকেই কঠোরভাবে উদ্যোগ ও মনোযোগী প্রশাসন প্রয়োজন। এফবিসিসিআই প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর কাছে বাজেটের কিছু মূল অগ্রাধিকার—অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি—র কারণে অভিনন্দন জানিয়েছে।
বাজেটে জিডিপি বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এফবিসিসিআই মনে করে, টেকসই অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে এই লক্ষ্য অর্জন অত্যাবশ্যক।
তবে এফবিসিসিআইয়ের উদ্বেগ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে। প্রস্তাবিত রাজস্ব সংগ্রহ নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকায়, যা সংগঠনের দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তারা বলেন, বর্তমান অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গেলে রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতেই হবে এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) জোরালো সংস্কার জরুরি।
আরও এক উদ্বেগ—বাজেট ঘাটতি পুষাতে সরকার যদি ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ায়, তা বেসরকারি খাত থেকে ঋণপ্রাপ্তিকে ঘিরে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। ব্যাংক থেকে সরকারি অধিকঋণ বেসরকারি বিনিয়োগকে ঋণপানে পিছনে রাখলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তারা সতর্ক করেছে। ফলে স্থানীয় ব্যাংকের ওপর চাপ না বাড়িয়ে, সুলভ শর্তে এবং সতর্কতার সঙ্গে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নের দিকে বেশি নজর দিতে এফবিসিসিআই পরামর্শ দিয়েছে।
সংগঠনটি বাজেটের সামাজিক সুরক্ষা ও প্রণোদনা পদক্ষেপগুলোর প্রশংসা করেছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ের মতো উদ্যোগ তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের প্রতিদান বাড়াতে সহায়ক হবে বলে মনে করে তারা। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সহজ করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ ২০২৬’ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিশেষ গুরুত্ব প্রদানের উদ্যোগকে উৎসাহব্যঞ্জক আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল যুক্তরাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে ল্যাপটপ ও কম্পিউটার সামগ্রী আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের পদক্ষেপকে এফবিসিসিআই সরকারের অনন্য প্রয়াস হিসেবে বর্ণনা করেছে।
নারী ও যুব উদ্যোক্তা তৈরির জন্য ৫০০ কোটি টকার বিশেষ বরাদ্দ এবং স্টার্টআপদের জন্য কর অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাবে সংগঠনটি সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তবে তারা পরামর্শ দিয়েছে করমুক্ত আয়ের সীমা—বর্তমানে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা—আরও বাড়ানো উচিত, বিশেষ করে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির পটভূমিতে। এছাড়া সর্বোচ্চ করহার ৩৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব করেছেন তারা, যা বিনিয়োগ ও উদ্যোগের ক্ষেত্রে প্রণোদনমূলক ভূমিকা রাখবে বলে তারা মনে করেন।
একই সঙ্গে বাজেটে রডসহ নির্মাণ সামগ্রীর ওপর ভ্যাট বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে নেতিবাচক বলেছে এফবিসিসিআই; তাদের আশঙ্কা, তা নির্মাণ খাতের ব্যয় বাড়িয়ে কাজের খরচ ও কর্মসংস্থান কমিয়ে দিতে পারে।
সংগঠনের সমাপ্ত বক্তব্য হলো—ঘোষিত সংস্কার ও প্রকল্পগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে এ বাজেট দেশের জন্য উপযোগী হবে; নতুবা কাগজে থাকা পরিকল্পনাই থেকে যাবে। তাই দক্ষ প্রশাসন, নিরপেক্ষ স্বচ্ছতা ও দৃঢ় বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত বাজেটের সফলতা নির্ধারণ করবে।