শুক্রবার, ১৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রিজার্ভ চুরির মহাকেলেঙ্কারিতে ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অভিযুক্ত

দীর্ঘ এক দশক ছাড়ানো ধোঁয়াশা ও বারবার বিলম্বের পর অবশেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলার খসড়া অভিযোগপত্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার ওই খসড়া চার্জশিটে দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে উল্লেখ করা হয়েছে—তাদের মধ্যে আছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তা ও সাবেক গভর্নরসহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

সিআইডির মুখপাত্র জসীমউদ্দিন খান বলেছেন, খসড়া অভিযোগপত্রটি পুরোপুরি প্রস্তুত করা হয়েছে এবং সেটি আইনি চুলচেরা বিশ্লেষণের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল মামুন জানিয়েছেন, তদন্ত প্রক্রিয়া শতভাগ সম্পন্ন; দৃশ্যত আর কোনো কাজ বাকি নেই এবং খুব দ্রুত আদালতে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল করা হবে।

অভিযোগপত্র তৈরিতে তদন্তকারীরা ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্ট, ফিলিপাইনের মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর), মার্কিন এফবিআইয়ের রিপোর্ট, জাপান ও ভারতের বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ, শ্রীলঙ্কা থেকে অর্থ ফেরতের কাগজপত্র, সুইফটের অভ্যন্তরীণ তথ্য, বিস্তৃত তদন্ত নথিপত্র ও ১৬১ ধারায় নেওয়া সাক্ষীদের জবানবন্দিসহ নানা প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। এসব উপাত্ত ও সাক্ষ্য–প্রমাণ টুকে প্রায় দশ হাজার পৃষ্ঠার ডকেটে অপরাধের বিশদ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

খসড়া অভিযোগপত্রে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নাম থাকা মূল ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি আনিস এ খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মহাব্যবস্থাপক কে এম আবদুল ওয়াদুদ, সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক রেজাউল করিম ও মেজবাউল হক, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা, অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের সাবেক উপপরিচালক জুবায়ের বিন হুদা, সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. সুলতান মাসুদ আহম্মেদ এবং গভর্নর সচিবালয়ের মহাব্যবস্থাপক এ এফ এম আসাদুজ্জামান।

ফিলিপাইন থেকে বেশ কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামও অভিযোগপত্রে উল্লেখ আছে—যাদের মধ্যে রয়েছেন জামা-জরী কিছু ব্যক্তি এবং রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবি), ফিলরেম সার্ভিস করপোরেশন, সেঞ্চুরিটেক্স ট্রেডিং, আব্বা ও বিকন কারেন্সি এক্সচেঞ্জ ইনকরপোরেশন, মাইডাস ক্যাসিনো ও সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনোও। শ্রীলঙ্কার আট জন (সাত ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠান—ভুয়া ‘শালিকা ফাউন্ডেশন’) এবং ভারতের কয়েকজন, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গ্রুপ ও ব্যক্তিসহ চীন ও জাপানের ঠিকানা-সংবলিত নামগুলোও অভিযোগপত্রে আছে।

ঘটনাটির সারসংক্ষেপ—২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করে প্রতারকরা ৩৫টি ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে নিউইয়র্কে রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচুর অর্থ মহাসড়কে নামিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার (তৎকালীন হিসাবে প্রায় ৮১০ কোটি টাকা) লোপাট করার চেষ্টার চেষ্টা চালানো হয়; কোনো এক ট্রান্সফার শ্রীলঙ্কার একটি এনজিওর নামে পাঠানোর সময় ইংরেজি বানানের ত্রুটির কারণে সন্দেহ নজরে পড়ে এবং সেই এক ট্রান্সফার আটকে যায়। তবে বাকি চারটি সফল ট্রান্সফারের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা ফিলিপাইনের মাকাতি শহরের আরসিবিসি ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখায় গিয়েছে। সেখানে আগে থেকে খোলা চারটি ভুয়া অ্যাকাউন্টে সেই অর্থ জমা করে মুদ্রান্তর ও লেনদেন ছদ্মপথে চালানো হয়; পরে বিভিন্ন ক্যাসিনোর মাধ্যমে পেসোতে রূপান্তর করে সেগুলো জুয়ার টেবিলে ঢেলে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে একটি ক্যাসিনো মালিকের কাছ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার উদ্ধার করে বাংলাদেশ সরকারকে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হলেও বাকি অর্থের হদিস মেলাতে কঠোর কষ্ট হয়েছে। নিউইয়র্কের আদালতে বাংলাদেশ ব্যাংক আরসিবিসির বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছে, যেখানে মূলত ওই অর্থের লোপাট, রূপান্তর ও জালিয়াতির বিষয়টি বিবেচ্য।

তদন্তে উঠে এসেছে যে আন্তর্জাতিক এই জালিয়াতিতে ‘নেস্টেগ’ ও ‘ম্যাকট্রাক’ জাতীয় মারাত্মক ম্যালওয়্যার ব্যবহার করে সুইফট নেটওয়ার্কে গোপন গলি তৈরি করা হয়েছিল। মামলার বিবরণে বলাহয়, উত্তর কোরিয়ার পরিচিত হ্যাকারদের—লাজারাস গ্রুপের—সামান্য বা প্রত্যক্ষ সহায়তাও ছিল।

এত বড় মামলার দীর্ঘ সময় পেছানোয় জনমনে হতাশা ছিল—বিচারিক পদ্ধতিতে প্রতিবেদন দাখিল বহুবার বিলম্বিত হয়েছে। আদালত রিপোর্ট দাখিলের দিন কয়েকটির মতো ৯০-এর বেশি বার পিছিয়েছে। গতবারের রেকর্ড অনুযায়ী রিপোর্ট দাখিলের সময়েও বারবার বৈঠক পরিলক্ষিত হয়েছে। চূড়ান্ত খসড়া দাখিলের এই মোকামটি দেশে ও প্রতিষ্ঠানে একটি নতুন আস্থা ফিরিয়ে আনার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। তিনি বলেছে, দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের ক্ষুণ্ণ হওয়া ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় অংশ প্রাপ্ত করা সম্ভব হবে—এটাই তাদের আশা।

গত কয়েকবছরে মামলার অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক ও অনন্য উদ্যোগও দেখা গেছে—একপর্যায়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মীমাংসার চেষ্টা করলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তদন্তভার হস্তান্তরে সম্মত হয়নি এবং সিআইডিইই দীর্ঘদিন তদন্তের ধারা বজায় রেখেছে।

সিইডির তদন্ত বিভাগ যখন পুরো মামলাটির প্রমাণ-পাঠ পরিপাটি করে খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেছে, তখন অনেকের চোখ এখন আদালতের দিকে—এই দীর্ঘতম সাইবার ডাকাতি ও অর্থপাচারের ঘটনায় কারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কিভাবে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং দেশের রিজার্ভের দুর্নীতি প্রতিরোধে ভবিষ্যতে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, তা এখন বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন