নকআউট পর্বে কোনো ভুলের সুযোগ নেই — ব্রাজিলও এই কথাটাই বেশি ভাবছে। হিউস্টনে আজ সোমবার রাত ১১টায় তাদের মুখোমুখি হচ্ছে জাপান; ম্যাচটি কেবল শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করাই নয়, এক বছরের আগের সেই অপমানের বদল নেয়ার আরেকটা সুযোগও জরুরি সেলেসাওরার জন্য।
ব্রাজিল-জাপানের মধ্যে গতকাল-আবহে তোলপাড় করা টোকিওর প্রীতি ম্যাচটি সমর্থকদের ভুলে যায়নি। ২০২৫ সালের অক্টোবরের ওই ম্যাচে প্রথমার্ধে ২-০ এগিয়ে গেলেও দ্বিতীয়ার্ধে সবকিছু বদলে গিয়ে জাপান ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নেয়—ব্রাজিলের কাছে হতাশার সেই স্মৃতি এখনো তাজা।
এই বিশ্বকাপে বরং ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে ব্রাজিলে। গ্রুপ পর্বে মরক্কোর সঙ্গে ১-১ ড্র করার পর তারা টানা দুই জয় তুলে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়েছে। আক্রমণে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের ছন্দ অসাধারণ; চার গোল করে তিনি দলের প্রধান ভরসায় পরিণত হয়েছেন। দীর্ঘ চোট থেকে ফিরে এসে নেইমারও দলে, যার অভিজ্ঞতা ও সৃষ্টিশীলতা সেলেসাওরাকে বাড়তি শক্তি দিয়েছে।
তবু জাপানকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। গ্রুপ পর্বে তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ، দ্রুত ও সংগঠিত ফুটবল দেখা গেছে—প্রেসিং থেকে দ্রুত আক্রমণে পরিবর্তনের দক্ষতা তাদের বড় সুবিধা। কোচ হাজিমে মোরিয়াসু অগ্রিম সতর্ক করে দিয়েছেন, এবার আরও ক্ষুধার্ত ও তীক্ষ্ণ ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে হবে তাদের।
ম্যাচের সবচেয়ে বড় লড়াই হবে মাঝমাঠে। ব্রাজিল দ্রুত বল দখল করে উইং থেকে আক্রমণ গড়ে দিতে চাবে; ভিনিসিয়াস, রায়ান ও তাদের গতিশীল ফরোয়ার্ডরা কখনোই অবহেলা করার মতো সময় দেয় না। বিপরীতে জাপানের শক্তি তাদের সংগঠিত ডিফেন্স, দ্রুত প্রেসিং ও রক্ষণ থেকে আক্রমণে রূপান্তরিত হওয়ার তাগিদে নিহিত।
ট্যাকটিক্যাল দিক থেকে কাগজে-কলমে ব্রাজিল এগিয়ে — ব্যক্তিগত গুণাবলী, বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা ও আক্রমণের ভ্যারিয়েশন তাদের পছন্দের দিক। তবে যদি জাপান শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে খেলে এবং ম্যাচটিকে বেশি সময় গোলশূন্য রাখতে পারে, তখন চমকের সম্ভাবনাও কম নয়। বিশ্বকাপ তো সবসময়ই এক ভুলে বড় উলটফেরত দেখায়।
ব্রাজিল শিবিরে সুসংবাদও আছে—শনিবার সকালে পূর্ণ স্কোয়াড দিয়ে তারা অনুশীলনে নেমেছে, যদিও গত শুক্রবার নানা কারণে কয়েকজন খেলোয়াড় ছিলেন অনুপস্থিত। তবে নেইমারের ব্যাপারে হতাশা নেই; দীর্ঘ চোটের পর ফিরলেও তার ম্যাচ ফিটনেস পুরোপুরি ৯০ মিনিট টানা খেলার মতো নয় বলে ট্রেইনাররা জানিয়েছেন। তাই কোচ কার্লো আনচেলত্তি নেইমারকে শুরু থেকেই নামানোর বদলে ‘সুপার সাব’ হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছেন; পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্বিতীয়ার্ধে তাকে মাঠে নামানো হবে।
রাফিনিয়া চোটের কারণে এই নকআউট মিশনে নেই—উরুর চোট পুরোপুরি সেরে ওঠেননি, তাই তিনি ব্রাজিল দলের সঙ্গে হিউস্টনে যাচ্ছেন না এবং নিউ জার্সিতে থেকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন চালাবেন। এটা ব্রাজিলের জন্য বড় ক্ষতি হলেও দল প্রস্তুত আছে।
জাপানের দলে আশার খবর আগোমুখে এসেছে—তাকেফুসা কুবো চোট থেকে সেরে আবার অনুশীলনে ফিরেছেন। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে অ্যাসোসিয়েশন ম্যাচে হাঁটুর চোট পেয়ে মাঠ ছেড়ে যাওয়ার পর তিনি তিউনিসিয়া ও সুইডেনের ম্যাচে ছিলেন না, কিন্তু এখন প্রটেকটিভ ব্যান্ডেজ পরে অনুশীলন করতে দেখা গেছে তাকে। ক্লাব ক্যারিয়ারে রিয়াল মাদ্রিদ ও অন্যান্য বড় ক্লাবে খেলার অভিজ্ঞতা থাকা কুবো জাপানের আক্রমণে স্পন্দন যোগ করতে পারে।
বিশ্বকাপ অঙ্গনে জাপান দীর্ঘদিন ধরে উন্নতি করেছে—নিশ্চিতভাবে বড় দৃশ্যমান সাফল্য এসেছে। ব্রাজিলের সাবেক তারকা জিকোও জানিয়েছেন, জাপানকে কম দেখলে ভুল হবে; তারা যেকোনো দলের বিরুদ্ধে প্রস্তুত থাকা দল। আর কিছু পর্যবেক্ষক, যেমন জার্মান অর্থনীতিবিদ জোয়াকিম ক্লেমেন্ট, ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে এই রাউন্ডে জাপানই ব্রাজিলকে হারাতে পারে।
ফাইনাল রোডম্যাপে এই ম্যাচের গুরুত্বও অনেক—‘সি’ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল যদি জিততে পারে, তাহলে শেষ ষোলোতে তাদের প্রতিপক্ষ হবে নরওয়ে ও আইভরি কোস্টের মধ্যকার ম্যাচের বিজয়ী। তাই হিউস্টনে আজকের সন্ধ্যায় মাঠে নামা দলটি নিজেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে চাইবে।
সব মিলিয়ে, হিউস্টনে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার মিলনে একটি উচ্চদাবী নকআউট ম্যাচ অপেক্ষা করছে—ক্ষুধার্ত ব্রাজিল নিজ বিশেষত্ব প্রমাণ করতে চাইবে, আর জাপান সুযোগ পেলেই সেলেসাওরার সপক্ষে চমক দেখাতে প্রস্তুত।