বৃহস্পতিবার, ২রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্ববাজারে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশের বাইসাইকেল শিল্প

রপ্তানিতে অপ্রচলিত পণ্যের মধ্যে আশা জাগানো বাংলাদেশি বাইসাইকেল শিল্প দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে ফের শক্ত অবস্থানে ফিরে আসছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব কমে এবং ব্যাচেনগিরি ঠিক থাকায় গত কয়েক বছরের ধাক্কার পরে খাতটি দ্রুত পুনরুদ্ধার করছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-র সর্বশেষ তথ্যে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই–মে) সাইকেল রপ্তানি আয় হয়েছে ১৩ কোটি ৮৭ লাখ ৪৮ হাজার ডলার — যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি।

রপ্তানির পরিসংখ্যান ও বাজার পরিস্থিতি

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করা হলে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৬ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ডলারের রেকর্ড রপ্তানি অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এরপর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও চাহিদা সংকোচনের ফলে পরবর্তী দুটা অর্থবছরে আয় চানাধীনভাবে কমে দাঁড়ায়: ১৪ কোটি ২২ লাখ এবং পরবর্তীতে ৮ কোটি ২৪ লাখ ডলারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকেই বাজার ধীরে ধীরে পুনরায় চাঙ্গা হতে শুরু করে এবং ওই বছরে রপ্তানি আসে ১১ কোটি ৬৪ লাখ ৩৬ হাজার ডলার। চলতি অর্থবছরের মে মাসে রপ্তানিতে রেকর্ড ৬০ দশমিক ৫২ শতাংশ বৃদ্ধিও ধরা পড়েছে। যদি জুন মাসের আয়ও মে মাসের সমান হয়, তাহলে এই অর্থবছরের শেষে রপ্তানি আয় পূর্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বৈশ্বিক অবস্থান ও নতুন বাজার

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাইসাইকেল রপ্তানিতে বাংলাদেশ বর্তমানে তৃতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক এবং বিশ্ববাজারে অষ্টম স্থানে রয়েছে। মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ সাইকেল যায় ইউরোপীয় দেশগুলোতে; এর মধ্যে যুক্তরাজ্য ও জার্মানি সবচেয়ে বড় ক্রেতা। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বাংলাদেশের উপস্থিতি বেড়েছে — বিশেষ করে চীনের ওপর শুল্ক বাড়ায় আমেরিকান ক্রেতারা বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে বাংলাদেশে নজর দিয়েছেন। পাশাপাশি ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অস্ট্রেলিয়াতেও বাংলাদেশি সাইকেলের চাহিদা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক ও শিল্পগোষ্ঠী

দেশীয় রপ্তানির বড় অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছে মেঘনা গ্রুপ; বর্তমানে মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশের দায়িত্ব তাদের হাতে। তাদের এমঅ্যান্ডইউ সাইকেল ও হানা সিস্টেমস অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিকারক হিসেবে পরিচিত। প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ বছরে ১৫ লাখ সাইকেল উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে নিজের অবস্থান দৃঢ় করছে। পোশাক খাতের পানাম গ্রুপও সাইকেল রপ্তানিতে জড়িত হয়ে দ্রুত শীর্ষ পাঁচে উঠেছে। বিদেশি বিনিয়োগে চালিত আলিতা বাংলাদেশ লিমিটেড এবং স্থানীয় করভো সাইকেলও নিয়মিত রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছে। এসব কোম্পানির সক্রিয়তায় শিল্পে উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষমতা বাড়ছে।

নতুন প্রযুক্তি: ইলেকট্রিক বাইসাইকেল

শিল্প এখন শুধু সাধারণ সাইকেলে সীমাবদ্ধ নয়; উচ্চমূল্যের ইলেকট্রিক বাইসাইকেল (ই-বাইক) রপ্তানি করে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই সফলতা দেখাচ্ছে। পানাম গ্রুপ গত বছর থেকে ডেনমার্কসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ই-বাইক রপ্তানি শুরু করেছে। বৈশ্বিক বাজারে বর্তমানে বিক্রি হওয়া মোট সাইকেলের প্রায় ৩০ শতাংশ ইলেকট্রিক হওয়ায় দেশীয় উদ্যোক্তারা এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। চাকা, টায়ার, প্যাডেল, হ্যান্ডেল ও আসনের মতো মৌলিক যন্ত্রাংশ দেশেই উৎপাদিত হওয়ায় উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে শক্ত হচ্ছে এবং প্রতিযোগিতামূলক দামে বাজারে টিকে থাকা সহজ হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ইউরোপিয়ান সাইক্লিস্ট ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপে বার্ষিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন সাইকেল বিক্রি হতে পারে। এই বড় চাহিদাকে কাজে লাগাতে রপ্তানিকারকরা উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো, আধুনিক কারখানা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। যুদ্ধের সময়ের ধাক্কা কাটিয়ে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন হিসেবে সাইকেলের জনপ্রিয়তা বেড়ে উঠায় বাংলাদেশের এই ইঞ্জিনিয়ারিংভিত্তিক পণ্য খাতের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বলে মনে করেন বিশ্লেষক ও উদ্যোক্তারা।

পোস্টটি শেয়ার করুন