বুধবার, ৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোনালদোর বিশ্বকাপ জয়ের আজীবন স্বপ্নের করুণ অবসান

ফুটবল যেন আগেই স্ক্রিপ্ট লিখে রেখেছিল—একপাশে ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের উল্লাস, অন্যপাশে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিষাদমাখা বিদায়। ডালাস স্টেডিয়ামে ২০২৬ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ১৬ ম্যাচে স্পেন ইনজুরিতে যোগ করা সময়ের গোলে পর্তুগালকে ১-০ হারিয়ে কোয়ার্টারফাইনালে উঠেছে। সেই গোলটি করে দলের বদলি মেলেন মিকেল মেরিনো—আর এ ঘটনায় ফুটবল ইতিহাসে এক আবেগঘন অধ্যায়ের অবসান ঘটল: ৪১ বছর বয়সী মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো চিরবিদায় নিলেন বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে।

নির্ধারিত ৯০ মিনিটের শেষ হয়ে যখন বহু দর্শক অতিরিক্ত সময় দেখার অপেক্ষায় ছিলেন, তখনই ৯১ মিনিটে মঞ্চে নামা মেরিনো সুযোগটি কাজে লাগান। ফেরান তোরেসের নিখুঁত থ্রু পাস পেয়ে দুই ডিফেন্ডারের ফাঁক বেয়ে দ্রুত বক্সে ঢুকে গিয়ে তিনি নিচু ও নিশ্চিত শটে গোল করে দেন। গোলের পর স্টেডিয়াম কেঁপে ওঠে স্প্যানিশ সমর্থকদের চিৎকারে, আর পর্তুগিজ শিবিরে নেমে আসে নাচকান রোগের মতো নীরবতা।

শুরু থেকেই দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আক্রমণাত্মক ছিল। অষ্টম মিনিটে স্পেন এগিয়ে যেতে পারত—তবে মিকেল ওইয়ারজাবালের শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে পর্তুগাল বেঁচে যায়। কিছুক্ষণ পর রোনালদোর শক্ত শট কর্নার হিসেবে ফিরিয়ে দেন স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন। ৩৮ মিনিটে জোয়াও ফেলিক্সের হেড এবং ফিরতি বল থেকে রোনালদোর চেষ্টা একইভাবে সিমনের ধাঁচে ব্যর্থ হয়। প্রথমার্ধের শেষ দিকে নুনো মেন্ডিসের শট পেদ্রো পোরোর দেহে পড়ে পোস্টে লাগায়—এটাও পর্তুগালকে ভাগ্যবান রাখে।

দ্বিতীয়ার্ধে উভয়কে কৌশল পরিবর্তন করতে দেখা গেছে। পর্তুগালের কোচ রবার্তো মার্তিনেজ ৭১তম মিনিটে রাফায়েল লেয়াও ও ডিয়োগো দালট নামিয়ে আক্রমণ জোরদার করার চেষ্টা করেন। কিন্তু লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্প্যানিশরা মাঝমাঠে বল দখল রেখে পর্তুগালকে চাপে রেখেছিল। লামিনে ইয়ামালের এক দুর্দান্ত ফ্রি-কিক ডিয়োগো কস্তা সেভ করলেও শেষ পর্যন্ত পর্তুগাল তা রক্ষা করতে পারেনি—মেরিনোর একক গোলই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিল।

রোনালদোকে এই বিশ্বকাপে বিদায় নিতে দেখা ছিল বেদনার হলেও সম্মানজাক। ২০০৬ সালে যে বিশ্বকাপ থেকে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬-এ ডালাসের মাঠেই তা সমাপ্ত হলো। ম্যাচজুড়ে স্পর্শবহুল ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিল সীমিত—তিনি পুরো ম্যাচে বল স্পর্শ করেছেন মাত্র বারো বার। মেরিনোর গোলের পর পর্তুগাল মরিয়া আক্রমণে গেলেও বার্নার্দো সিলভার হেড লক্ষ্যভ্রম্ম হয় এবং সব আশা শেষ হয়ে যায়।

সর্বশেষ সাইরেনের পরে দেখা গেল এক হৃদয়বিদারক চিত্র—সহকর্মী এবং প্রতিপক্ষরা তাকে ঘিরে সান্ত্বনা দিলেন, আর রোনালদো ঢাকঢাক করে কাঁদতে থাকলেন। তিনি এখনও একমাত্র খেলোয়াড় যিনি পাঁচটি আলাদা বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি করেছেন; তবু সোনালি ট্রফি তার হাতে ওঠেনি। ডালাসের গ্যালারি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সম্মান জানালেন এই কিংবদন্তিকে, যিনি আক্ষেপভরা চোখে মাঠ ছাড়লেন।

স্পেন এই জয়ের সঙ্গে কোয়ার্টারফাইনালে উঠে এল এবং এই বিশ্বকাপে এখনও কোনো গোল হজম করেনি তাদের রক্ষণভাগ। শেষ আটে তাদের প্রতিপক্ষ হবে বেলজিয়াম। রোনালদোর বিদায় সত্যিই একটি যুগের সমাপ্তি—তবে ডালাসের রাতটি ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে থাকবে একটি নাটকীয় লড়াই ও এক কিংবদন্তির আবেগঘন বিদায়ের সাক্ষী হিসেবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন