ইরানের হামলার আশঙ্কায় তুরস্ক ত্যাগের সময় পুরোনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ বিমানে ফিরে এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি কাতারের উপহার হিসেবে সংস্কার করা নতুন বিমানেই গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) আঙ্কারায় পৌঁছিলেন — এ ছিল ওই নতুন বিমানের প্রথম আন্তর্জাতিক সফর। কিন্তু বুধবার (৮ জুলাই) রাতে তুরস্ক ছাড়ার সময় তিনি আকস্মিকভাবে সেই নতুন বিমানে না উঠে পুরোনো বিমানটিতেই রওনা হন।
পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত কয়েকজনের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে পুনরায় সংঘাত বাড়ায় নিরাপত্তাজনিত সতর্কতা হিসেবে এ পরিবর্তন আনা হয় এবং সিক্রেট সার্ভিসের জোরালো পরামর্শে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি মিলডেনহলে নামার পর আবার নতুন বিমানে চড়ে ওয়াশিংটন ফিরেছেন।
নিরাপত্তা বিষয়ক এ আচরণ থেকেই নতুন বিমানটিকে নিয়েও প্রশ্ন ওঠার ঘটনা চলছে। প্রেসিডেন্ট যত দ্রুত সম্ভব নতুন বিমানটি কাজে লাগাতে উৎসাহী ছিলেন, কিন্তু এক বছরেই সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা যোগ করা হয়েছে কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। কয়েকজন আইনপ্রণেতা এবং সরকারি কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে তাড়াহুড়ো সময়সীমার কারণে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য নিরাপত্তা আপগ্রেডগুলো হয়ত পুরোপুরি সংযোজন করা সম্ভব হয়নি।
হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চিউং এক বিবৃতিতে বলেন, ‘নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান একটি অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ। এতে উচ্চমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে, যা প্রেসিডেন্ট এবং তার কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি যেমন বলেছেন, তিনি অনেক শত্রুর লক্ষ্যে আছেন। তাই এসব হুমকি মোকাবিলায় আমরা আমাদের হাতে থাকা সব ধরনের উপায় ব্যবহার করি, যার মধ্যে বিভ্রান্তিমূলক কৌশল এবং দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর ব্যবস্থাও রয়েছে।’
কিন্তু স্পর্শকাতর নিরাপত্তা বিষয় নিয়ে কথা বলা কয়েকজন ব্যক্তি, যারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্তব্য করেছেন, জানান নতুন বিমানটিতে পুরোনো বিমানটির সব সক্ষমতা নেই। তাদের মতে আঙ্কারায় ফেরার সময় বিমানের দ্রুত পরিবর্তনটি কোনো নির্দিষ্ট হুমকির মোকাবিলায় নয়, বরং সিক্রেট সার্ভিসের পরামর্শমতে নেওয়া একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ ছিল।
ট্রাম্প নিজে নতুন বিমানটির বিলাসবহুল সুবিধায় মুগ্ধ ছিলেন এবং গত সোমবারে নতুন বিমানেই ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্ক গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ে এবং প্রেসিডেন্ট ও ন্যাটো নেতারা যখন আঙ্কারায় ছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালায়।
বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) ট্রাম্প নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ নিয়ে বিমান পরিবর্তনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি চাইছিলেন নতুন বিমানটি আগে থেকেই রওনা হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে থামিয়ে সেখানে থাকা সেনাদের দেখানো হোক—এ কারণেই তিনি সাময়িকভাবে পুরোনো বিমানে ফিরেছেন। তিনি নতুন বিমানের প্রশংসা করে বলেছিলেন, এটি ‘অসাধারণ’।
আঙ্কারায় সাংবাদিকদের চাপের মুখে তিনি বারবার বলেন যে, তিনি ইরানের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। এমনকি এক পর্যায়ে তিনি উল্লেখ করেন যে সাম্প্রতিক সময়ে তাকে তেহরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা দেখানো হয়েছে বা সে সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে।
ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি মেসেজে বলা হয়েছিল, তিনি ‘পুরোনো দিনের স্মৃতির খাতিরে’ আঙ্কারা থেকে পুরোনো বিমানেই রওনা দেবেন এবং নতুন বিমানটি মিলডেনহলে নিয়ে যায়া হবে যাতে সেখানে থাকা আমেরিকান সেনারা সেটি ঘুরে দেখতে পারেন। সিক্রেট সার্ভিস বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি এবং রাষ্ট্রপতির নিজের পোস্টটিকেই এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট যখন দ্রুতভাবে পুরোনো বিমানে ওঠেন, তখন সঙ্গে থাকা সাংবাদিকরা সাধারণত যেভাবে সিঁড়ি বেয়ে উঠার ছবির সুযোগ পান, সে সুযোগ পাননি। এছাড়া টেকঅফের আগে যাত্রীদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল। উড়োজাহাজটি গভীর রাতে মিলডেনহলে অবতরণ করে; পরে প্রেসিডেন্ট নতুন বিমানে উঠে ওয়াশিংটনে ফিরে যান। ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘সম্ভবত জানালার পর্দা নামাতে বলা হয়েছিল, কারণ ইরানের হুমকির কারণে তারা ‘একটি বিপজ্জনক উড়োজাহাজে’ ছিল।’’
দীর্ঘকাল ধরে জানা যায়, পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে এমন কিছু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে যা আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রকে বিভ্রান্ত করতে বা অকার্যকর করতে সক্ষম। কাতারের উপহৃত নতুন বিমানটিতে এসব ক্ষমতা কতটুকু যোগ করা হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। প্রতিরক্ষা শিল্প ও পেন্টাগনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এ ধরনের বিস্তৃত নিরাপত্তা উন্নয়ন করতে প্রায় একশ কোটি ডলার পর্যন্ত খরচ এবং দুই বছরের মতো সময় লাগতে পারে। তবে এ সম্পর্কে কংগ্রেসে দেওয়া সাক্ষ্যবক্তব্যে বিমানবাহিনীর এক কর্মকর্তা ট্রয় ই. মেইঙ্ক জানিয়েছেন, ‘‘এই পরিবর্তনের ব্যয় সম্ভবত চল্লিশ কোটি ডলারেরও কম হবে।’’
নতুন বিমান নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে নিরাপত্তা ও সক্ষমতা সম্পর্কে রহস্য ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে—এবং এ নিয়ে এখনও প্রশ্ন ও উদ্বেগ জারি আছে।