শনিবার, ১১ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৭শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিনাজপুর থেকে টিনজাত ভুট্টা রপ্তানি হচ্ছে স্পেন, ইতালি ও পর্তুগালে

দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে ইউরোপের বাজারে্চ সদ্য টিনজাত ভুট্টা রপ্তানি শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ও স্পেনের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘স্পেন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ’ গত ৬ জুন থেকে প্রথম চালান পাঠানো শুরু করেছে। উদ্বোধনী চালানে মোট ২০০ কনটেইনার প্রক্রিয়াজাত ভুট্টা স্পেন, ইতালি, পর্তুগালসহ অন্যান্য ইউরোপীয় বাজারে যাচ্ছে; এই চালানের আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় ৬০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৭৩ কোটি ২০ লাখ টাকা)।

পর্বতীপুরে স্থাপিত এ কারখানাটি দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী শেলটেক গ্রুপ ও স্পেনভিত্তিক সেলেরিও গ্রুপ যৌথভাবে তৈরি করেছে। প্রকল্পটিতে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার চুক্তিবদ্ধ কৃষক উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ভুট্টা চাষ করছেন এবং এ পর্যন্ত প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। শেলটেক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যে ভালো সম্ভাবনা দেখেই তারা এই খাতে প্রবেশ করেছে; সেলেরিও গ্রুপ প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের বিপণনের দায়িত্ব নেবে।

কারখানায় ভুট্টা প্রথমে কঠোর মানদণ্ডে যাচাই-বাছাই করা হয়। এরপর পুরো প্রক্রিয়াজাতকরণ কর্মপ্রণালী স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালানো হয় — ক্যান বা কৌট আকারে ভুট্টা প্রক্রিয়াজাত করে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সুরক্ষিত রাখা হয় এবং কনটেইনারভর্তি করে রপ্তানি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে পার্বতীপুর কারখানায় উৎপাদিত সব প্রক্রিয়াজাত খাবার সেলারিওর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হবে, ফলে বাজারজাতকরণের দুশ্চিন্তা তাদের কম থাকবে।

প্রকল্পের জন্য কৃষিদের দেওয়া সুবিধার মধ্যে রয়েছে বিনামূল্যে হাইব্রিড বীজ সরবরাহ ও ফসল কেনার শতভাগ নিশ্চয়তা। গত বছরের জুনে স্পেন থেকে আনা বিশেষ জাতের বীজ ব্যবহার করে চুক্তিভিত্তিক চাষ শুরু হয়। প্রচলিত স্থানীয় ভুট্টার এক ছড়ার ওজন সাধারণত ২০০–২৫০ গ্রাম হলেও এই হাইব্রিড বীজে ছড়ার ওজন ৪০০–৫০০ গ্রাম পর্যন্ত উঠছে। বর্তমানে ৪ হাজার কৃষক যুক্ত থাকলেও ভবিষ্যতে এই নেটওয়ার্ক ৪০ হাজার কৃষিতে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ভুট্টার পাশাপাশি কারখানায় আনারস প্রক্রিয়াজাতকরণও শুরু হয়েছে; টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকা থেকে আনারস সংগ্রহ করে টিনজাত করা হচ্ছে রপ্তানির জন্য। ভবিষ্যতে আম প্রক্রিয়াজাতকরণ, ফ্রুট ককটেল, শুকনা আনারস ও শুকনা আমসহ তাজা আম ও লিচু রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে। তানভীর আহমেদ বলেন, পার্বতীপুর প্ল্যান্টের বার্ষিক প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি ক্ষমতা এখন ১৫–১৭ কোটি ডলার; পূর্ণ সক্ষমতায় এটি ২০ কোটি ডলারে উন্নীত করা যাবে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য পূরণে আশা রয়েছে।

শেলটেক গ্রুপের কৃষি খাতের পাশাপাশি আবাসন ও শিল্পে বড় বিনিয়োগও চলমান। রাজধানীর বনশ্রীতে তাদের ৫৩ কাঠা জায়গায় ‘শেলটেক লিগ্যাসি প্লাজা’ নামের ১৭ তলা আধুনিক শপিংমল নির্মাণ করা হচ্ছে — প্রায় ২ লক্ষ বর্গফুট আয়তনের এই বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৭৫ কোটি টাকা; এখানে থাকবে প্রায় ৩৫০টি দোকান ও ফুড কোর্ট ইত্যাদি সুবিধা।

আরও জানিয়েছেন, জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে যৌথ উদ্যোগে ২১টি আবাসিক প্রজেক্টে ২৬৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। ব্লেন্ডেড সুতার উৎপাদন বাড়াতে এনভয় টেক্সটাইলসে প্রায় ১৭৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে এবং সিলেটে অ্যাব্রেসিভ পেপার উৎপাদনকারী গ্রাইন্ডটেক লিমিটেডে ৮৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগ হিসেবে বিভিন্ন কারখানায় কার্বন নিঃসরণ কমাতে ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

বর্তমানে শেলটেক ও এনভয় লিগ্যাসি গ্রুপের ৩১টি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং গ্রুপে কর্মরত কর্মীসংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। ২০৩০ সালের মধ্যে কর্মীসংখ্যা ৫৮ হাজার এবং বার্ষিক লেনদেন ৯ হাজার ২০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

তানভীর আহমেদ বলেন, মোট মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের কাজ তারা এক থেকে দুই বছর আগেই শুরু করেছেন। মূল উদ্দেশ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনা, আমদানির বিকল্প দেশীয় পণ্য তৈরির মাধ্যমে বাজার উত্তরাধিকার করা এবং ভেন্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন নিশ্চিত করে ঝুঁকি কমানো—এগুলো বিবেচনায় রেখে এই বিনিয়োগ নেওয়া হয়েছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন