স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করার সাহস ও অধ্যবসায়ের উজ্জ্বল উদাহরণ নীলাওয়ান রাখাইন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) পালি বিভাগের সাবেক এই মেধাবী শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সুযোগ অর্জন করেছেন—ক্লেমসন ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটন এবং কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটি। এর মধ্যে ক্লেমসন ও ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটন থেকে তিনি পুরোপুরি অনুদানভিত্তিক (ফুল ফান্ডেড) পিএইচডি স্কলারশিপ পেয়েছেন।
কক্সবাজারের রাখাইন সম্প্রদায়ে জন্ম নেওয়া নীলাওয়ান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের পালি বিভাগের একজন পরিচিত মুখ। তিনি শিক্ষাবিদ, শিক্ষক প্রশিক্ষক ও সমাজকর্মী হিসেবে ইতোমধ্যেই সক্রিয়; ইউনিসেফ এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে শিক্ষক প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। পাশাপাশি তিনি ‘‘চালুং একাডেমি’’ নামে একটি শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করে যাচ্ছেন, যেখানে তরুণদের শিক্ষা ও দক্ষতা বিকাশে কাজ করেন।
নীলাওয়ানের এই পথচলা মোটেই সোজা ছিল না। এক মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়ার কারণে শিক্ষা ও সুযোগের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাকে। অনার্স পড়ার সময় কিছু মানুষ তাকে নিরুৎসাহিত করেছিল, কেউ বলেছিল পালি বিষয়ে ভবিষ্যৎ নেই, আবার লিঙ্গভিত্তিক নানা সীমাবদ্ধতার মুখেও পড়েছেন তিনি। তবে এসব বাধাই তাকে পিছনে না ঢুকিয়ে আরও দৃঢ় হতে প্রলুব্ধ করেছে—সমালোচনা ও বৈষম্যকে তিনি নিজের শক্তিতে পরিণত করেছেন।
রাখাইন সম্প্রদায়ের অনেকেই উচ্চশিক্ষায় পৌঁছাতে পারেন না—এই বাস্তবতা জানেই নীলাওয়ান তার অর্জনকে আরও বিশেষ মনে করেন। তিনি মনে করেন, তার সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, একই সঙ্গে তার সম্প্রদায়ের তরুণদের জন্য সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দেয়ার এক প্রতীক। তিনি আশা করেন, তার গল্প অন্যদের অনুপ্রেরণা হবে, এবং আরও অনেকে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে আসবে।
নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে নীলাওয়ান বলেন, “আজ আমি গর্বিত যে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করার পথে এগোচ্ছি। রাখাইন সম্প্রদায় থেকে উঠে এভাবে সুযোগ পাওয়ায় আমি বিশেষভাবে গর্বিত।” তিনি সবাইকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন—নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখতে বলেছিলেন এবং সতর্ক করতেন যে কখনোই অন্যকে আপনার সম্ভাবনা নির্ধারণ করতে দিবেন না। তার পরামর্শ: বড় স্বপ্ন দেখুন, কঠোর পরিশ্রম করুন এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন।
এই সাফল্যের পেছনে পরিবারের অবদানও অনেক। নীলাওয়ান বলেছেন, তার স্বামীর অটুট সমর্থন প্রতিটি কঠিন সময়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বাবার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণাও তার জন্য সবসময় আশীর্বাদের মতো ছিল। পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের সমর্থন তাকে দীর্ঘ এই যাত্রায় এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
নীলাওয়ান নিজেকে একজন যোদ্ধা মনে করেন—জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জ তাকে আরও শক্তিশালী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করেছে। তিনি বলেন, এটা কেবল শুরু; ভবিষ্যতে তিনি তার অর্জন, অভিজ্ঞতা ও পথচলার গল্প আরও অনেকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার প্রতীক্ষায় আছেন। তার এই সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প অনেক মেয়ে ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার এক দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড়াবে বলেই আশা করা যায়।