ভারত বরাবরই বিএনপি এবং আওয়ামী লীগকে তাদের ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল আদর্শের জন্য স্বাভাবিক মিত্র হিসেবে দেখে আসছে। তবে সময়ের সাথে সাথে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা ভারতের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে বিএনপির দিকে। সম্প্রতি ঢাকায় বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে আসা আঞ্চলিক নেতাদের মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। কালো পোশাক পরে জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার ছেলে এবং বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দুঃখ ও শোকপ্রকাশের জন্য দেখা করেন, যেখানে তাদের মুখে ছিল শোকের ছায়া। সেই এসময় তিনি তারেক রহমানের হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি চিঠি তুলে দেন। এরপর সোশ্যাল মিডিয়ায় এক্সে তিনি জয়শঙ্করের বৈঠকের ছবি শেয়ার করে লেখেন, “ভারত সরকারের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে এবং বিশ্বাস প্রকাশ করা হয়েছে যে, বেগম খালেদা জিয়ার স্বপ্ন ও আদর্শ আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে পথ দেখাবে।” এ খবর জানিয়েছে আল জাজিরা।
প্রায় তিন দশক ভারত প্রকাশ্যে বা গোপনে বিএনপির বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে কার্যক্রম চালিয়েছে, বিশেষ করে খালেদা জিয়ার স্বপ্ন ও আদর্শের বিরোধিতা করে। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের শাসনকাল থেকে শুরু করে মূলত তার জনপ্রিয়তা ও মিত্রতা বিস্তার পেয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী এবং পাকিস্তানপন্থী দলের সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিন ধরে, যা ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ ছিল। বিএনপির বর্তমান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জাজিরাকে বলেন, ঢাকায় তারেক রহমানের সঙ্গে জয়শঙ্করের বৈঠক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন পরিস্থিতিকে নতুন দিশায় নিয়ে যেতে পারে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের পতনের পর নয়াদিল্লির বাংলাদেশে মনোভাব আরও পরিবর্তিত হয়। বিএনপি ক্ষমতা হারানোর পর থেকে প্রায় স্বেচ্ছায় রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বেরিয়ে গেছেন তারেক রহমান, এবং যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের কিছু পদক্ষেপে তিনি নিজেকে পরস্পরেটিভভাবে পুনরুদ্ধার করেছেন। যেহেতু বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর জোট ভেঙে গেছে, তাই ভবিষ্যতে এই দুই দলের সম্পর্ক এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তারেক রহমান নিজেকে এখন আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জোটবদ্ধ নেতার রূপে দেখাতে চান, যেখানে সংখ্যালঘুরা নিরাপদ থাকবে—এমন সংকেত তিনি দিচ্ছেন। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেছেন, তারেক রহমানের ভাষন শুনে মনে হয় তিনি ‘নির্বাচিত বিদেশি অবস্থানে’ আছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি ও তারেক রহমানের এই পরিবর্তন ভারতের জন্য একটি স্বস্তির সংকেত। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ মতামত দেন, ভারতে মনে করা হয়, বিএনপির বিচ্ছেদে এখন তারেক রহমান এক গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপদ ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন।
ভারত মনে করে, তারেক রহমান ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশের জঙ্গি গোষ্ঠী ও পাকিস্তানপন্থী শক্তিগুলোর তৎপরতা সীমিত হবে, যা ভারতের স্বার্থে। তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, তারেক রহমান এখন মূলত ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন। তাঁরা বলছেন, তিনি বুঝতে পেরেছেন, যদি সফলভাবে প্রধানমন্ত্রী হতে চান, তাহলে ভারতের সমর্থন বা অনুক্রম তার জন্য অপরিহার্য।
অপর দিকে, জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির বিশিষ্ট অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেছেন, বর্তমানে তারেক রহমান এখনও স্বাভাবিকভাবে নিজের অবস্থান শক্ত করে তুলছেন, যা দেশের Stabilitate আনতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল করার পর বিএনপি এখন বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে, আর তারেক রহমানই এখন নিকট ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আন্তর্জাতিক আস্থাখণ্ড। এই পরিস্থিতি বিশ্বনেতাদের চোখকে বাংলাদেশের দিকে ফিরিয়ে আনা আরও সহজ করে তুলছে।





