শুক্রবার, ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৩শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

২০২৬ বিশ্বকাপ: টিকিট, হোটেল এবং ভাড়ার আকাশছোঁয়া খরচ

গত বছরের ৫ ডিসেম্বর ফিফা বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে শুরু হয়েছে এক অস্থির ‘ডমিনো এফেক্ট’। ইতিহাসের এই বৃহৎ ফুটবল মহাযজ্ঞকে ঘিরে টিকিটের চাহিদা রেকর্ডের বাইরে চলে গেছে, পাশাপাশি স্বাগতিক শহরগুলোর আবাসন ও যাতায়াতের খরচ আশ্চর্যকরভাবে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিশ্লেষকদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ ফুটবল এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যয়বহুল আসর হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেল। যারা গালারিতে বসে খেলা দেখার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের জন্য এখনকার পরিস্থিতি এক ধরনের আর্থিক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আসরের এই ব্যয়বহুলতার অন্যতম মূল কারণ হলো টিকিটের আকাশছোঁয়া মূল্য ও এর মন্দের অনুপস্থিতি। ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত ফিফার লটারি प्रणालीতে প্রায় ৫০ কোটির বেশি মানুষ টিকেটের জন্য আবেদন করেছেন, যা এক বিশাল রেকর্ড। আজ, ৫ ফেব্রুয়ারি, আবেদনকারীদের ই-মেইলের মাধ্যমে জানানো হচ্ছে কার ভাগ্যে এই মূল্যবান টিকিট জোটছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, চাহিদা এত বেশি যে কালোবাজারি বা রিসেল মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। তবে শুধু টিকিট পাওয়াই শেষ নয়; স্বাগতিক দেশগুলোয় থাকার ব্যবস্থা করাও এখন সমর্থকদের জন্য এক বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম সংলগ্ন এলাকার একটি হোটেলের ভাড়া প্রদর্শন করে হতবাক হয়ে যেতে হয়। সাধারণ সময়ে এই হোটেলের এক রাতের খরচ ছিল মাত্র ১৫৩ ডলার, কিন্তু বিশ্বকাপের সময় সেই একই রুমের চড়া ভাড়া উঠেছে ৪৫১০ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২৮ হাজার শতাংশের বেশি। শুধু হোটেল নয়, এয়ারবিএনবি বা বুকিং ডটকমের মতো প্ল্যাটফর্মেও ভাড়ার গ্রাফ উল্কার মতো ঊর্ধ্বগামী। ড্রয়ের পর থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো শহরগুলোতেও আবাসনের অনুসন্ধান ১৬০ শতাংশ বেড়েছে। অনেক বাড়িতে তিন রাতের জন্য ভাড়া চাওয়া হচ্ছে প্রায় ৩৫ হাজার ডলার পর্যন্ত। এই বিশাল পর্যটক চাপের মাঝে পর্যাপ্ত হোটেল ও আবাসন ব্যবস্থা না থাকাও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কারণ।

বিশ্বকাপের এই আকাশচূড়া খরচের তালিকায় নতুন সংযোজিত হয়েছে পার্কিং ফি। লস অ্যান্ডেলেসের মতো শহরে ফিফার অফিসিয়াল পার্কিং স্পটের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫০ থেকে ৩০০ ডলার পর্যন্ত, যা অনেক সময় সাধারণ টিকিটের দামেরও উপরে চলে গেছে। বিস্ময়কর হলো, এই অর্থ খরচ করেও সমর্থকদের এক মাইলের বেশি হাঁটা ট্রেড করে স্টেডিয়ামে পৌঁছাতে হবে। ফিফা দাবি করছে, এই দীর্ঘ হাঁটা তাদের জন্য ‘যৌক্তিক’, কিন্তু সাধারণ দর্শকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

চাহিদা আরও বাড়ার সুযোগ নিতে অনেক বাড়ির মালিক এখন অসাধু পন্থা অবলম্বন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, অগ্রিম কম দামে বুকিং করা যায়, কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যে এই বুকিংগুলো ‘রক্ষণাবেক্ষণ’ বা ‘সফটওয়্যার ত্রুটি’ এর অজুহাতে বাতিল করে আবার খুব দ্রুত তিন গুণ বেশি দামে লিস্টিং করা হচ্ছে। এয়ারবিএনবির কর্তৃপক্ষ এমন মালিকেদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালেও দুর্ভোগ কমছে না ফুটবলপ্রেমীদের। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এর আগে ‘টেইলর সুইফট ইফেক্ট’ দেখা যেতে পারে; তবে এবার বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করবে এক প্রলয়ঙ্কারী ‘ওয়ার্ল্ড কাপ ইফেক্ট’। ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত ধরে চলা এই আসরের মাধ্যমে শুধু আবাসন খাতে শত কোটি ডলারের লেনদেন হবে বলে ধারণা। সব মিলিয়ে, ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের এই মহাযজ্ঞের পাশাপাশি ব্যয়ের দিক থেকেও একটি নতুন এবং কঠিন ইতিহাস গড়ে তোলার পথে এগুচ্ছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন