অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তির কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রকাশ করেছে। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে এই চুক্তির কিছু অংশ বাংলায় অনুবাদ করে পাঠানো হয়েছে।
চুক্তির মধ্যে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাহী আদেশ নম্বর ১৪২৫৭ দ্বারা বাংলাদেশের মতো বেশ কিছু দেশের ওপর মার্কিন পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সরকার মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে যোগাযোগ করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর অনুরোধ জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের জবাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্দিষ্ট শুল্কহার নিয়ে একটি অভিন্ন সুরাহা চুক্তির খসড়া পাঠানো হয়, যার মধ্যে বাংলাদেশে নির্ধারিত হয় ২০ শতাংশ নির্দিষ্ট শুল্ক হার।
বাংলাদেশি পণ্য ও মার্কিন পণ্যবিনিময়ে পারস্পরিক শুল্ক আরোপের বিষয়ে আলোচনা চলতে থাকে। দীর্ঘ ৯ মাসের ধারাবাহিক ও গঠনমূলক আলোচনার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক শুল্কহার ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নেতৃত্ব দিয়েছে, সাথে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন আন্তঃমন্ত্রণালয় পরামর্শ গ্রহণ ও বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তীশক্তি প্রস্তাবিত চুক্তিতে বৈচিত্র্যময় বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যেমন পণ্য, সেবা, বাণিজ্যিক প্রবিধান, কাস্টমস সহজীকরণ, রুলস অব অরিজিন, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা, কারিগরি বাধা, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, সরকারি ক্রয়, শ্রম, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও সহযোগিতা। বাংলাদেশের আগে থেকে ডব্লিউটিও ট্রিপস চুক্তি স্বাক্ষর থাকায় কিছু শর্তের পরিবর্তন হয়নি। এছাড়াও, অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তি বা দাপ্তরিক প্রস্তুতি থাকায় অনেক বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনার অঙ্গীকার করায়, মূলত পোশাক শিল্পের জন্য কার্যকর সুবিধা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকের শুল্ক সুবিধা থাকায় এর বাজার ধরে রাখতে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ। বিশেষ করে, তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে পোশাক তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে শুল্ক বাড়বে না, অর্থাৎ ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপের বিষয়ে মুক্তি পাওয়া যায়।
বিষয়টির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, কেম্বোডিয়া এবং বাংলাদেশসহ প্রায় ১৫টি দেশের সঙ্গে পারস্পরিক শুল্কচুক্তি সম্পন্ন করেছে। ভারত ও জাপানের সাথে চুক্তি অপ্রকাশিত হলেও আলোচনা এগিয়ে চলছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুবিধাজনক অবস্থান দৃশ্যমান, যেমন- ড্য지털 ট্রেডে একাধিক সুবিধা এবং উৎপত্তির নিয়ম সহজতর হয়েছে।
অতিরিক্তভাবে, বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রায় ২৫০০ পণ্যের শূন্য শুল্ক সুবিধা অর্জন, যার মধ্যে রয়েছে ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, কাঠজাত ও অন্যান্য পণ্য। এর বিপরীতে, মার্কিন পণ্য বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের জন্য ৭,১৩২টি ট্যারিফ লাইনে শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪,৪৪১টি ট্যারিফের শুল্ক ইতিমধ্যে শূন্য। আরও ১৫৩৮টি লাইনের শুল্কহার পরবর্তী ৫ বছরে শুল্কবিরতিতে আনা হবে, আর ৬৭২টি লাইনের শুল্কহার ১০ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে। কিছু লাইনের জন্য শুল্ক সুবিধা এখনও দেওয়া হয়নি।
আলোচনার অগ্রগতির মাঝে অনেক বিষয়ে বিশেষ সুবিধা বা শর্ত অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যেমন, ডিজিটাল ট্রেড, ই-কমার্স, মেডিকেল ডিভাইস ও ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষি ও খাদ্য পণ্য, বিনিয়োগ, পরিবেশ, শ্রম নীতিমালা, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন, ফিশারিজ সাবসিডি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও শ্রম আইন সংশোধন—এসব বিষয় চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এছাড়াও, চুক্তিতে প্রস্থান বা বাতিলের সুযোগও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
সর্বমোট, এই পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করবে, প্রসারিত করবে দুদেশের ব্যবসার পরিসর, বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করবে এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।





