বুধবার, ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী: গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়ের শুভসূচনা

জাতীয় রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো — তারেক রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। আজ (মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টার পরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ করান। একই অনুষ্ঠানে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরাও শপথ গ্রহণ করেন।

বঙ্গভবনের রেওয়াজ ভেঙে এবারে শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় জাতীয় সংগীত এবং কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি প্রধানমন্ত্রী পদে তারেক রহমানের নাম ঘোষণা করেন; এরপর তিনি প্রত্যাশিত পূর্ণাঙ্গ ও গোপনীয়তার শপথ পাঠ করেন এবং শপথপত্রে স্বাক্ষর করেন।

শপথ অনুষ্ঠানে বিদেশি ও দেশীয় উচ্চপর্যায়ের অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ছিলেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু, ভূটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে, ভারতীয় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, পাকিস্তানের পরিকল্পনা মন্ত্রী আহসান ইকবাল, শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য ও গণমাধ্যম বিষয়ক মন্ত্রী নালিন্দা জয়াসিতা, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মা প্রমুখ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, তিন বাহিনীর প্রধান, কূটনীতিক এবং বিভিন্ন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

আহবান অতিথির তালিকায় ছিলেন আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও—অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস তার মেয়ে দীনা আফরোজকে নিয়ে অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। উপদেষ্টাদের মধ্যে আছেন অধ্যাপক আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও চৌধুরী রফিকুল আববার। সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে দেড় হাজারের কাছাকাছি অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান এবং মেয়ে জাইমা রহমানও উপস্থিত ছিলেন।

তারেক রহমানের শপথগ্রহণ শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের আরও এক দফা সফলতা হিসেবে ধরা হচ্ছে। তারেকের পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান ও পরে রাষ্ট্রপতিও ছিলেন; ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হন তিনি। তার পর থেকেই দলটির নেতৃত্বে উঠে আসেন বেগম খালেদা জিয়া, যিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন — ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে। গত ৩০ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার ফলে জিয়া পরিবার বিশ্বে কয়েকটি রাজনৈতিক পরিবারের তালিকায় যোগ দিল, যেখানে পরিবারের তিন সদস্য একের পর এক রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালিত করেছেন।

তারেক রহমান দীর্ঘ সময় বিদেশে — প্রধানত যুক্তরাজ্যে — নির্বাসন জীবন কাটিয়েছেন। ৬০ বছর বয়সী তিনি দেশে ফিরেন গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর; ফিরে আসার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তার মা বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন। এরপর কার্যত একাধিক জনসমাবেশ ও সংগঠনীক তৎপরতার মধ্য দিয়ে তিনি দলের শাসনভার গ্রহণ করেন এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই দলকে সুসংগঠিত করে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি দেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন ও নির্বাচনী সংস্কারের অঙ্গীকার করে চলেছেন। দলকে মাঠপর্যায়ে সংগঠিত করতে তিনটি মাস ব্যাপী তৎপরতা ও প্রচারণা চালান; টানা প্রায় ৪০ দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে সক্ষম করে দলের ব্যাপক জয়লাভ।

ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের পরিচয়—তারেক রহমান ১৯৬৭ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি অংশ নেন ১৯৮৮ সালে; বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সালে তাকে দলের যুগ্ম মহাসচিব করা হয়। পরে তিনি সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান ও সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হন এবং দাবি করা হয় যে কারাগিনিবাসের সময় তিনি নির্যাতনের শিকার হন; ২০০৮ সালে তিনি চিকিৎসার জন্য জামিনে ছাড়া পান এবং পরে পরিবারের সঙ্গে লন্ডনে যান। প্রবাসে থাকাকালীনও তিনি দলের নীতি ও কৌশল নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন।

রাজনীতির দীর্ঘ ও উত্থান-পতনের পথে তারেকের নেতৃত্বে বিএনপির এই ফেরতকে অনেক বিশ্লেষক ‘‘দ্বিধামুক্ত দেশ পরিচালনার নতুন সূচনা’’ হিসেবে মূল্যায়ন করছেন। দুই দশকের পর দলটি আবার রাষ্ট্র পরিচালনায় আসছে এবং তিন দশকের পর নতুন প্রজন্মের একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিষিক্ত হলেন তারেক রহমান—এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবনে একটি লক্ষণীয় মোড়।

নতুন এ সরকারের সামনে রয়েছে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কার, এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মতো বড় চ্যালেঞ্জ। ভোটে প্রাপ্ত ব্যাপক জনসমর্থনকে কাজে লাগিয়ে তারেক রহমান কিভাবে এগোবেন—তারই উপর নির্ভর করবে আগামীকালের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিত্র।

পোস্টটি শেয়ার করুন