বিশ্বের দুইটি নাজুক কূটনৈতিক আলোচনার ফলাফলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার। জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরমাণু আলোচনা এবং ইউক্রেন-রাশিয়া শান্তি সংলাপ সম্পর্কিত আশা-ভয়ের কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম আপাতত স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। বিনিয়োগকারারা এসব আলোচনার প্রতিটি সংকেতকে খুব নজর দিয়ে দেখছেন, কারণ এগুলো ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারের গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে পারে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী আজ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২৩ সেন্ট বা ০.৩৪ শতাংশ কমে ৬৮.৪২ ডলার হয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন মানদণ্ড ডব্লিউটিআই-এর দাম ব্যারেলপ্রতি ১.০৮ শতাংশ বেড়ে ৬৩.৫৭ ডলারে ফিরে এসেছে।
দামের এই মিশ্র প্রতিরূপের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে ‘‘প্রেসিডেন্টস ডে’’ উদযাপন হওয়ার কারণে মার্কিন কড়া বাজারে কোনো আনুষ্ঠানিক মূল্য নির্ধারিত হয়নি—এটি মঙ্গলবারের দরেক পাশে সামঞ্জস্য সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলো—চীন, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরে চন্দ্র নববর্ষের ছুটির কারণে লেনদেনের পরিমাণ সাময়িকভাবে কমেছে, যা বাজারে তীব্র ওঠানামা রোধ করেছে। বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদে বাজারের স্থিতিশীলতা মূলত জেনেভায় চলমান আলোচনার ওপর নির্ভর করছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে জ্বালানি রুট ও নিরাপত্তায় সরাসরি প্রভাব ফেলবে। উত্তেজনা কমলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত হবে—গণনা অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই গমন করে। অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে কোনো স্থায়ী সমাধান হলে রাশিয়ার ওপর থাকা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে রুশ তেল বিশ্ববাজারে ফিরলে সরবরাহ বাড়বে এবং চাপে পড়ে দাম নেমে আসার সম্ভাবনা থাকবে।
নয়াদিল্লিতে অবস্থিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘এসএস ওয়েলথস্ট্রিট’-এর প্রতিষ্ঠাতা সুগন্ধা সচদেবা বলেছেন, বর্তমানে চাহিদা-সরবরাহের প্রথাগত সূত্রের চেয়ে কূটনৈতিক সংকেতই তেলের দামের ওপর বেশি প্রভাব রাখতে শুরু করেছে। ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি দামকে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় আটকে রেখেছে এবং যদি আলোচনায় অচলাবস্থা বা নেতিবাচক সংকেত আসে, তাহলে মূল্য যে কোনো সময় বড় ধরনের ওঠানামার মুখে পড়তে পারে।
জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ ও গোপনীয় সংলাপ চলছে। আলোচনায় মার্কিন পক্ষে জ্যারেড কুশনার এবং স্টিভ উইটকফ অংশ নিচ্ছেন, আর ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। শুরুতেই ইরান সতর্ক করে জানিয়েছে, ওয়াশিংটনকে বাস্তবসম্মত দাবি রাখতেই হবে। এ সময়ই পারস্য উপসাগরে ইরানের সামরিক মহড়া হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে, তবে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো সমস্যার কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, জেনেভা সংলাপের চূড়ান্ত রূপই আগামী দিনে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের দিশা নির্ধারণ করবে। বিনিয়োগকারা ও বাজার অংশগ্রহণকারীরা প্রতিটি কূটনৈতিক সূচককে গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ ছোট থেকেই বড় কোনো সংকেত দ্রুত দাম ও সরবরাহে প্রতিফলিত হতে পারে।





