বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওই ঐতিহাসিক দিনে অর্থনীতিতে আরও এক সুখবর এসেছে—দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সংরক্ষণ বা গ্রস রিজার্ভ ১৭ ফেব্রুয়ারি দিনশেষে ৩৪.৫৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম–৬ হিসাব অনুযায়ী রিজার্ভ রাখা হয়েছে ২৯.৮৬ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য।
রিজার্ভ বাড়ার পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ৩১৭ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ৩.১৭ বিলিয়ন), আর ফেব্রুয়ারির প্রথম ১৬ দিনে এসেছে প্রায় ১৮০ কোটি ৭০ লাখ ডলার (প্রায় ১.৮০৭ বিলিয়ন)। রেমিট্যান্সে এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ডলার বাজারে সরবরাহ বাড়াতে এবং মুদ্রাসংকট শিথিল করতে বড় অবদান রেখেছে।
প্রবাসী আয়ের পাশাপাশি আমদানি খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং রপ্তানিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখাটাও রিজার্ভ বৃদ্ধির অন্যান্য কারণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রায় ৪.৯০ বিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছে, যা পরোক্ষভাবে রিজার্ভ আরও জোরালো করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মজুত গত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষিতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২২ সালে ডলারের মূল্য উচ্চতরে ওঠার সময় প্রতি ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে ১২২ টাকায় পৌঁছেছিল এবং তখন রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছিল, যা তখন রিজার্ভকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় নিয়ে যায়।
কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মুদ্রা পাচার ও হুন্ডি প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতি পেয়েছে। সেই উদ্যোগ এবং বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স বেড়ে যাওয়ায় রিজার্ভ পুনরায় শক্তিশালী হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সাড়ে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি রিজার্ভ নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ঘাঁটি তৈরি করবে। এটি আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করবে। মুদ্রাবাজারে স্থিরতা ফিরে আসায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও ব্যবসার পরিচালন খরচ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে—যা নতুন প্রশাসনের জন্য সুবিধার বিষয় হবে।
সামগ্রিকভাবে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় এই রিজার্ভের বৃদ্ধিকে অধিকাংশ বিশ্লেষক দেশের ভবিষ্যতের জন্য এক আশাব্যঞ্জক সংকেত হিসেবে দেখছেন। তবে অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, আমদানি ও রপ্তানির সুষম নীতি এবং প্রবাসী আয় বজায় রাখার কাজ অব্যাহত রাখা জরুরি বলে তারা মনে করেন।





