অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে নেওয়া কয়েকটি বড় সিদ্ধান্ত দেশটির অর্থনীতিকে নাজুক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। ফলে নতুন সরকারের সামনে সিদ্ধান্ত নেওয়া আরও জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে—বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন নতুন সরকারকে হয় অতিরিক্ত টাকা ছাপাতে হবে, নয়তো বেশি পরিমাণ ঋণ নিতে হবে, যা বাজেট ও মুদ্রাস্ফীতি—সবই চাপাবে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল কেবল রুটিন কাজ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু মাত্র ২৫ দিনে (১ ডিসেম্বর থেকে ২৫ জানুয়ারি) তড়িঘড়ি করে ৬৪টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ছয় হাজার ৯৯৩ কোটি (১,০৬,৯৯৩ কোটি) টাকা। এর মধ্যে ৪০টি প্রকল্প—যার মূল্য ৭৯ হাজার ৩৫৬ কোটি (৭৯,৩৫৬ কোটি) টাকা—সম্পূর্ণ নতুন। দেড় বছর মেয়াদে ওই সরকার ১৩৫টি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, মোট বাজেট ধরা হয়েছে দুই লাখ তিন হাজার (২,০৩,০০০) কোটি টাকা।
রাজস্ব ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বড় প্রকল্পগুলোর জন্য বিদেশি ঋণের দিকে ঝুঁকেছে। ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরে সরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণের দায় দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হিসাব অনুযায়ী মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই ঋণের বোঝা প্রায় ৪৬ শতাংশ বেড়েছে। যদি আইএমএফ ও সরকারের গ্যারান্টি-ভিত্তিক ঋণগুলোও যোগ করা হয়, তবে প্রকৃত দায় আরও বেশি হবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ ৬৫ শতাংশ পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। একই সময়ে একটি বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রস্তাবিত নবম পে স্কেল বাস্তবায়ন হলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বছরে আনুমানিক ১,০৬,০০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে—এটি বাজেট শূন্যকালের জন্য বড় বোঝা।
অপর এক বড় সিদ্ধান্ত ছিল রাষ্ট্রীয় বিমান বহর আধুনিকীকরণ। অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অংশ হিসেবে বোয়িং থেকে নতুন ২৫টি বিমান কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমানে পরিকল্পনায় অন্তত ১৪টি বিমান কেনার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। বিমানগুলো সরবরাহ শুরু হবে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে, তাই বর্তমান সরকারের সময়কালে সরাসরি কোনো সুফল পাওয়া যাবে না—ফলে এই সিদ্ধান্তে ভোটপ্রক্রিয়ার ঠিক আগে তাড়াহুড়ো ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন উঠেছে।
নৌসদর দপ্তর চীনের সঙ্গে চারটি নতুন জাহাজ কেনার ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে। ঢাকায় চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, ওই চারটির মধ্যে দুটি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাংকার এবং দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার—মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪ কোটি ১৯ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার (২৪,১৯,২০,০০০ ইউএসডি)। এর মধ্যে দুইটি ট্যাঙ্কারের জন্য ব্যয় হবে ১৫ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার এবং দুইটি বাল্ক ক্যারিয়ারের জন্য আট কোটি ৯৯ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক কর্মকর্তারা এসব সিদ্ধান্তকে সমালোচনা করেছেন। একজন সাবেক অর্থসচিব বলেন, মেয়াদের শেষ সপ্তাহে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক দায় তৈরি করা প্রশাসনিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী—বিশেষ করে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নির্বাচিত সরকারের ম্যান্ডেটে রাখা উচিত ছিল। তিনি উল্লেখ করেছেন, নির্বাচিত সরকার প্রতিপাদ্য নিয়ে কাজ শুরু করলেও বড় বাজেট ঘাটতি ও কঠোর শর্তের মুখে পড়ত।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, জরুরি না ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এড়িয়ে যাওয়া উচিত ছিল। বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যথাযথ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনার অভাব দেখা গেছে। বিআইডিএস-এর সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে. মুজেরি বলেছেন, কয়েক দিনের মেয়াদে এসে এ ধরনের বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া অযৌক্তিক ছিল—এগুলো পরবর্তী সরকারের নীতিনির্ধারণকে সংকুচিত করে দেয়।
সিপিডি-র সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মন্তব্য করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার পুরনো অবস্থার চেয়েও ঋণ পরিস্থিতিকে আরো নাজুক রেখে গেছে এবং বন্দরসহ করা বেশ কিছু বৈদেশিক চুক্তি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, নতুন সরকারকে টাকা ছাপানোর পরিকল্পনা করা উচিত নয়।
বিশ্লেষকরা একযোগে বলছেন, নতুন সরকারকে দ্রুত ও সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় চুক্তি ও ব্যয় পুনর্বিবেচনা করতে হবে, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলায় ফাঁক-মেরামত করে ধারাবাহিক নীতিমালায় ফেরত যেতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে বাজেট ও বছবার্ষিক ঋণপরিশোধের চাপ নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।





