ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও ইরানের পাল্টা আক্রমণের পর শান্ত করতে তেলবাজারে স্থিতি ফেরানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওয়াশিংটন সমুদ্রপথে বর্তমানে আটকে থাকা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য কেনাবেশায় ৩০ দিনের বিশেষ ছাড় দিয়েছে, যা আগামী ১১ এপ্রিল মধ্যরাত (ওয়াশিংটন সময়) পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য বিশ্ববাজারে জ্বালানির স্বাভাবিক জোগান পুনরুদ্ধার করা। এই ঘোষণার পরেই শুক্রবার (১৩ মার্চ) এশিয়ার বাজারে তেলের দাম কিছুটা থিতিয়ে এসেছে। বেসেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, সিদ্ধান্তটি ‘সুচিন্তিত’ ও ‘স্বল্পমেয়াদি’ এবং এর ফলে রাশিয়ার কোষাগারে বড় কোনো আর্থিক সুবিধা পৌঁছাবে না।
পটভূমি: মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও তেলের সরবরাহ সংকট
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকণ্ঠের সংঘাতে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তেলের সরবরাহে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সেই অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় ওয়াশিংটন এ ছাড় দিয়েছে যাতে সমুদ্রে আটকে থাকা তেল দ্রুত বাজারে আসতে পারে এবং সাময়িক ঘাটতি পূরণ করা যায়। ফক্স নিউজের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সমুদ্রে ছড়িয়ে থাকা রুশ তেলের পরিমাণ প্রায় ১২৪ মিলিয়ন ব্যারেল ছিল—যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন আগাতে তার কয়েক দিনের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রশাসন কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত থেকে ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল মুক্ত করার ঘোষণা করেছিল; এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ৩২টি সদস্য দেশের ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেলের প্রতিশ্রুতির অংশ। হোয়াইট হাউস তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আরও নানা পদক্ষেপ বিবেচনা করছে—জাহাজপথে বীমা ও আর্থিক নিরাপত্তা দিতে ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফিন্যান্স কর্পোরেশনকে নির্দেশ, প্রয়োজনে আমেরিকান নৌসেনার মাধ্যমে জাহাজে এসকর্ট দেওয়ার ঘোষণা এবং জোন্স অ্যাক্ট শিথিল করে বিদেশি জাহাজকে দেশের অভ্যন্তরীণ বন্দররোধ থেকে মুক্ত রাখার সম্ভাব্যতা আলোচনায় রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ কারণ—নভেম্বরে দেশটিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন রয়েছে এবং ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসে আধিপত্য ধরে রাখতে চাইছে; তাই জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ হোয়াইট হাউসের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ঝামেলা
বিশ্ববাজারে তেলের জোগান বাড়লেও এ পদক্ষেপটি রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল বলে ধরা হলে पश्चिमাদের আর্থিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা জটিল হয়ে উঠতে পারে। জি-৭ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শেষে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেছেন, এখন রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার উপযুক্ত সময় নয়।
রাশিয়ার বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ জানিয়েছেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট আলোচনায় তার ফ্লোরিডায় মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে; সেই দলের মধ্যে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ছিলেন। এ ছাড়া গত ৫ মার্চ আমেরিকা ভারতকেও একই ধরনের ৩০ দিনের বিশেষ ছাড় প্রদান করেছিল।
বাজার প্রভাব ও সমাপ্তি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ ও অস্থিরতার কারণে তেলের দরের ওঠানামা রাশিয়ার দৈনিক আয় বাড়িয়েছে; ইতোমধ্যে রাশিয়ার দৈনিক আয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে বিশ্ববাজারে জোগান বাড়ানোর মাধ্যমে দাম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে নীতি ও কূটনৈতিক জটিলতা বাড়ার সম্ভাবনা বজায় আছে।





