শুক্রবার, ৩রা এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দেশে তেলের মজুত থাকছে ১১ দিনের মতো; চলতি মাসে আসছে আরও ৩.৫ লাখ টন তেল

বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক নয়, তবে পরিস্থিতি একটু সতর্ক করার মতো। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে বর্তমানে তেলের মজুত মোটামুটি ১০ থেকে ১১ দিন চলার মতো। তবে চলতি মাসে স্বনির্ভরতা ও আমদানি কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশে আসছে যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, কাকেশাস্তান ও ভারত থেকে সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টন পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল। পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছে বিকল্প উৎস থেকে আরও কিছু চালান আনার বিষয়, যাতে দেশের জ্বালানি চাহিদা কিছুটা মেটানো সম্ভব হয়। জানানো হয়েছে, এপ্রিল মাসে কোনো জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা নেই এবং মাসের চাহিদা পূরণের পর তেল কিছুটা উদ্বৃত্তও থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অবশ্য বাস্তব চিত্র কিছুটা আলাদা। রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পের ছবি উঠে এসেছে মোটরসাইকেল ও কারের দীর্ঘ লাইনের। এই দৃশ্য বাস্তবতাকে সামনে এনেছে যে, তেল সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাম্পে গ্রাহকদের দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে নিত্য প্রয়োজনীয় গাড়ি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। রাইডশেয়ার চালকরা জানিয়েছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও তেল খুব কমই পাওয়া যাচ্ছে, যার কারণে তারা অনেকটাই অসুবিধার মধ্যে পড়েছেন। কয়েকশো টাকা খরচ করে গাড়ি চালানোর জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। চাকরিজীবীদের মধ্যেও একই পরিস্থিতি, তারা বলছেন, তেলের অভাবে অফিসে সময়মতো পৌঁছানো ও কাজের ব্যাঘাত ঘটছে। সাধারণ মোটরসাইকেল চালকরাও পাঁচ লিটার তেলের জন্য সারাদিন পাম্পের চক্রে থাকছেন, যার ফলে সময় ও অর্থের অপচয় হচ্ছে, আর এর ক্ষতিপূরণ হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি শুধু সাধারণ মানুষকেই নয়, দেশের অর্থনায়ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

মার্চের শেষের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশের মোট তেল পরিমাণে ডিজেল আছে ১০-১১ দিন, অকটেনের চাহিদা মেটাতে ৬-৭ দিন এবং পেট্রোলের মজুত ৮-৯ দিন। তবে, এর মানে এই নয় যে, খুব শিগগিরই তেলের অভাবে দেশ সম্পূর্ণরূপে অন্ধকারে ঢুকবে। জ্বালানি বিভাগের সূত্র বলছে, দেশের পাইপলাইনের মধ্যে এখনও বেশ কিছু চালান রয়েছে। কাজাখস্তান থেকে ১ লাখ টন ডিজেল আমাদানি করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, ইন্দোনেশিয়া থেকে আসছে ৬০ হাজার টন, আর ভারত থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল। এছাড়া, মে মাসের শুরুতে মধ্য এপ্রিলে আরও এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিকল্প উৎস থেকেও তেল আমদানির আলোচনা চলছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, “মধ্যপ্রাচ্যে থাকা তিনটি জাহাজ হরমুজ প্রণালির ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেলেই এগুলো দেশে আনা সম্ভব হবে। তাই সব বিকল্প পথ খোলা রাখা হয়েছে। এপ্রিল মাসে কোনও জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা নেই।” তিনি আরও বলছেন, “দেশীয় উৎস থেকে ৩০০ টন অকটেন সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে, পাশাপাশি আমদানির মাধ্যমে আরও ৫০০ টন যুক্ত হবে। এইভাবে দু’মাসের জন্য প্রয়োজনীয় ৮০০ টন অকটেন সরবরাহ সম্ভব হবে।” তিনি যোগ করেন, “ফ্র্যাকশন প্ল্যান্টে পর্যাপ্ত কাঁচামাল রয়েছে যা আগামী দুই মাসের জন্য সরবরাহ নিশ্চিত করবে।”

যদিও মাঠের পরিস্থিতি এসব দাবির সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না। পাম্পে দীর্ঘ লাইন, সরবরাহের সংকট ও অস্থিরতা এখনও চোখে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আনতে এবং সরবরাহব্যবস্থা শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে এখন গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন মন্তব্য করেছেন, জনগণ এখন প্যানিক বাইং করছে, অথচ সরকারের পক্ষ থেকে তাদের আশ্বস্ত করার জন্য উপযুক্ত প্রচার চালানো হচ্ছে না। তিনি বলছেন, সরকারের উচিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রধানমন্ত্রী করা মাধ্যমে জনগণকে নিশ্চিত করা যে, পেট্রোল ও অকটেনের সরবরাহে কোনো সমস্যা নেই। সংকট এড়াতে জ্বালানি ব্যবহার ও চাহিদা কমানোর উপরও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিলেন বিশ্লেষকরা।

পোস্টটি শেয়ার করুন