ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সেনারা অনেক ঘাঁটি ত্যাগ করে নিকটস্থ হোটেল ও অফিসে আশ্রয় নিচ্ছেন। তেহরানের হামলার ভয়ে ঘাঁটিগুলোতে নিয়মিত উপস্থিতি বেড়েছে না বলে নিরাপত্তা নানা ঝুঁকিতে পড়েছে—শুধু সামরিক কর্মীদের নয়, আশপাশে থাকা সাধারণ মানুষও বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের লক্ষ্যভিত্তিক হামলার ফলে কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জুড়ে স্থাপিত প্রায় ১৩টি মার্কিন ঘাঁটির অনেকটিই কাজ চালানো কঠিন বা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে। স্যাটেলাইট চিত্র প্রকাশে অন্তত ১৪ দিন বিলম্ব থাকায় ক্ষতির পরিমাণ চূড়ান্তভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে কুয়েতের আলি আল সালেম ঘাঁটিটি সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছে—রিপোর্টে বলা হয়েছে এখানে মোট ২৩ বার হামলার ঘটনা ধরা পড়েছে। ক্যাম্প আরিফজান ও ক্যাম্প বুহরিংেও প্রায় ১৭ বার হামলার রিপোর্ট এসেছে। এসব ঘাঁটির স্যাটেলাইট চিত্রে হ্যাঙ্গার, যোগাযোগ অবকাঠামো, স্যাটেলাইট যন্ত্রপাতি ও জ্বালানি সংরক্ষণাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার চিহ্ন পাওয়া গেছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ১৭ বার হামলা চালানো হয়েছে; বাহরাইনে ১৬ বার; ইরাকে ৭ বার; কাতারে ৬ বার; সৌদি আরবে ৬ বার এবং জর্ডানে ২ বার হামলার ঘটনা রয়েছে। আলি আল সালেমে একটি বড় গুদাম ধ্বংস হওয়ার ছবিও স্যাটেলাইটে ধরা পড়ে। সৌদির প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ঢালু ছাদযুক্ত একটি হ্যাঙ্গারের ধ্বংসস্তূপ দেখা গেছে।
কাতারের আল উদেদ বায়ু ঘাঁটিতে একাধিক অ্যান্টেনা ও স্যাটেলাইট অ্যারির ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল ধাফরা ঘাঁটিতে সেনাদের থাকার ব্যবহৃত একটি ভবনে বড় গর্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
ইরানি সূত্রে দাবি করা হয়েছে, এসব হামলায় ইরানের উন্নত খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। তদুপরি, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি থাড সিস্টেমের যন্ত্রাংশ রাখা চারটি স্থাপনাকেও লক্ষ্য করা হয়েছে বলে দাবি এসেছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS) কর্তৃক করা একটি সমীক্ষা অনুযায়ী যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৮০০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৬০০ মিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে; যার মধ্যে জর্ডানে অবস্থানরত একটি থাড রাডার ও অন্যান্য অবকাঠামোর ওপর আঘাতসংবলিত ঘটনা রয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন মিডিয়া অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যদি তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার শান্তি আলোচনায় ফল না আসে তবে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক আঘাত সম্পর্কে প্রস্তুতি নিচ্ছে—যাতে বিমান হামলার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে স্থলবাহিনীর বড় মোতায়েনও বিবেচনায় আনা হয়েছে। সাবেক ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান ইয়াল হুলাতা বলেছেন, প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ শেষ করার আগে এমন কোনো দৃশ্যমান সাফল্য চান যাতে ইরানকে কোনো প্রতীকী বিজয় দাবি করার সুযোগ না দেওয়া যায়।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং তাদের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি একাধিক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, দুবাইয়ের গোপন আস্তানায় অবস্থানরত প্রায় ৫০০ ইউনিটেরও বেশি মার্কিন সেনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে এবং ওই হামলায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে। ইরানি সংস্থা তাসনিম ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া এই দাবিগুলোর উদ্ধৃতি প্রকাশ করেছে; তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে যাচাইবাছাই এখনও অসম্পূর্ণ।
আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, দুবাইয়ের একটি হোটেল ও উপকূলীয় এলাকায় মার্কিন ড্রোন ইউনিটের কর্মকর্তাদের জমায়েত লক্ষ্য করে কামিকাজে বা আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে এবং কুয়েতের আল-শুয়াইখ বন্দরে থাকা কয়েকটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকেও হামলার লক্ষ্য বানানো হয়েছে।
মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও ঘাঁটিগুলোর ক্ষতি সম্পর্কে তথ্য-চিত্র ও স্যাটেলাইট ইমেজ প্রকাশে বিলম্ব থাকায় সঠিক ধাঁচের ক্ষতির চিত্র পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি। ফলে সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে, আর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কারণেও স্থানীয় পরিবেশ চাপে পড়েছে।
সারাংশ: ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বড় ধরনের প্রতিক্রিয়ার পরিকল্পনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান হামলার আশঙ্কায় মার্কিন সেনারা ঘাঁটি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বা ঘাঁটিতে অবস্থানহীনতা বাড়ছে—যার প্রতিক্রিয়া সামরিক, কূটনৈতিক এবং বেসামরিক নিরাপত্তা ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলছে।





