রবিবার, ৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২২শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মার্চে রপ্তানিতে বড় ধস, টানা আড়াই মাস নয়—আট মাস ধরে পতন চলছে

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে গভীর মন্দা দেখা দিয়েছে; চলতি অর্থবছরের মধ্যে মার্চ মাসে এককভাবে সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)–র সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত মার্চে রপ্তানি আয় গত বছরের একই মাসের তুলনায় ১৮ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে এবং এই ফলাফল টানা আট মাস ধরে নেতিবাচক প্রবণতার অংশ। দেশের বাণিজ্যিক ইতিহাসে টানা আট মাস রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার নজির আগে দেখা যায়নি, যা অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য বড় সতর্কবার্তা হিসেবে ধরা হচ্ছে।

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩৪৮ কোটি মার্কিন ডলার; যেখানে গত বছরের মার্চে আয় ছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে রপ্তানি আয় ঢেলে পড়েছে ৭৭ কোটি ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৯ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকার সমপর্যায়ে। সাধারণত মাসে পণ্য রপ্তানি দাঁড়ায় ৪০০–৫০০ কোটি ডলারের মধ্যে, কিন্তু মার্চে তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে চলতি অর্থবছরের গত ৯ মাসের (জুলাই–মার্চ) মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৩৯ কোটি ডলারে, যা গত বছরের একই সময়ে’র তুলনায় ৪.৮৫ শতাংশ কম।

বিশ্লেষকরা রপ্তানি আয় হ্রাসের পেছনে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রধান কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আরোপিত ২০ শতাংশ ‘পাল্টা শুল্ক’। গত বছরের আগস্ট থেকেই কার্যকর এই শুল্ক ব্যবহার করলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা ও প্রতিযোগীতা কমেছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় বাজারে চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগীরা কম দামে আক্রমণাত্মক সরবরাহ চালিয়ে বসেছে, ফলে বাংলাদেশ ব্যাকফুটে পড়ে যায়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল উৎপাদন থামা—মার্চে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কারখানাগুলোর গড়ে প্রায় ১০ দিন বন্ধ থাকার ফলে উৎপাদন কার্যত একটি তৃতীয়াংশ সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সরাসরি রপ্তানি পরিমাণে প্রভাব ফেলেছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও লজিস্টিক জটিলতাও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে রপ্তানি খাতকে আরও চাপে দিয়েছে।

তৈরি পোশাক খাত, যা বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান চালিকা শক্তি, তার অবস্থা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। একক পণ্য হিসেবে পোশাক রপ্তানি গত মার্চে ১৯.৩৫ শতাংশ কমেছে—গত বছরের মার্চে যেখানে পোশাক রপ্তানি হয়েছিল ৩৪৫ কোটি ডলার, সেখানে এবার তা নেমে এসেছে ২৭৮ কোটি ডলারে। বিজিএমইএর পরিচালক এবিএম শামসুদ্দিন এই পরিস্থিতির জন্য মার্কিন শুল্ক, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-ইসরায়েল সংকটকে উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে দেখেন।

পোশাক ছাড়া অন্যান্য বড় পণ্যগুলোর রপ্তানিও সংকটে পড়ে আছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী চলতি ৯ মাসে হোম টেক্সটাইল রপ্তানি কমেছে ২১ শতাংশ, ওষুধ রপ্তানি কমেছে ২০ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে ৭ শতাংশ, আর পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে ১৩ শতাংশ। সবজি রপ্তানিতে সবচেয়ে বেশি ধস—প্রায় ৪৫ শতাংশ কমেছে।

তবে সবখানেই নেতিবাচক না; কিছু ক্ষেত্রে সাফল্যও মেলেছে। প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি আয় ১৬ শতাংশ বাড়েছে, হিমায়িত মাছের রপ্তানি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কাঁকড়া রপ্তানি ৩৩ শতাংশ বাড়ায় খাতে কিছু স্বস্তি এসেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সংকট কাটাতে বৈশ্বিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বাজার বহুমুখিকরণ, উৎপাদন খরচ কমানো, লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নতুন বাজারে প্রবেশের নীতি গ্রহণ না করলে এ সমস্যা থেকে দ্রুত উত্তরণ কঠিন হবে। সরকার, ব্যবসায়ী সংগঠন ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া রপ্তানি খাতকে টেকসইভাবে পুনরুদ্ধার করা সহজ হবে না—এটাই এই ফলাফল থেকে পাওয়া প্রধান শিক্ষা।

পোস্টটি শেয়ার করুন