বুধবার, ৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্ন সাগরে বিলীন: লিবিয়ায় নৌকাডুবিতে অন্তত ৭০ নিখোঁজ, ৩২ উদ্ধার

ভূমধ্যসাগরে নতুন এক নৌকাডুবিতে লিবিয়ার উপকূলে অন্তত ৭০ জন অভিবাসী নিখোঁজ রয়েছেন; ৩২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও স্বেচ্ছাসেবী রেসকিউ দলগুলোর প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

উদ্ধার হওয়াদের বরাতে জানা গেছে, নৌকাটিতে আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ জন যাত্রী ছিল। জার্মান ভিত্তিক উদ্ধার সংস্থা সি ওয়াচের একটি বিমান দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে উল্টে যাওয়া নৌকাটি দেখে। বিমানে থাকা উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, নৌকার গায়ে অনেকেই আঁকড়ে ছিলেন, কয়েকজন পানিতে ভাসছিলেন এবং কিছু মরদেহও দেখা যায়।

ইতালীয় ও লাইবেরিয়ানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ উদ্ধারকার্যতে অংশ নেয়; জীবিতদের পরে ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপের কাছে নেওয়া হয়। উদ্ধার হওয়া সাতত্রিশ দুই জনের মধ্যে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিসরের নাগরিক রয়েছেন; সঙ্গে দুটি মরদেহও পাওয়া যায়।

আইওএম ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা বলেছে, নৌকাটি পুরোপুরি অনুপযুক্ত ছিল। যাত্রা শেষে জানা যায়, লিবিয়ার তাজৌরা বন্দর থেকে শুক্রবার রাত থেকে শনিবার ভোরের মধ্যে ছোট আকারের ওই নৌকাটি ছেড়ে যায়। পথে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল ঢেউয়ের ফলে নৌকায় পানি ঢোকে এবং কয়েক ঘণ্টার ভেতর সেটি ডুবে যায়।

বিশ্বজনীন রূপরেখায় এটি বাংলাদেশিদের জন্য এক বড় ধকল। কেবল সাম্প্রতিক কয়েকদিনে গ্রিস উপকূলে ঘটে যাওয়া আরও এক ঘটনায় ১৮ থেকে ২০ জন বাংলাদেশি নিহত হন; সেগুলোর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলার ১২ জনের নাম ও বাড়ি-ঠিকানাও জানানো হয়েছে। নিহতদের তালিকায় রয়েছেন—রাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের নুরুজ্জামান সরদার ময়না, আব্দুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান, ইসলাম উদ্দিনের ছেলে শাহান মিয়া, রনারচর গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান, বাসুরি গ্রামের মো. সুহানুর রহমান, মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েফ মিয়া, জগন্নাথপুরের চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁওয়ের শায়েখ আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুরের মো. নাঈম, পাইলগাঁওয়ের আমিনুর রহমান, ইছগাঁওয়ের মোহাম্মদ আলী ও দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে ফাহিম আহমেদ মুন্না।

নিহতদের স্বজনদের বরাত দিয়ে বলা হয়, দালালরা প্রথমে বড় নৌকায় রেখে ইতালি বা গ্রিসে পাঠানোর কথা বললেও পরে ঝুঁকিপূর্ণ ছোট প্লাস্টিকের নৌকায় তাদের সমুদ্রে ফেলে দেয়। দুই দিনের মধ্যে পৌঁছে যাবে বলে আশ্বাস দেওয়া হলেও ভুল রাস্তায় ছয় দিন বা তার বেশি সময় পর্যন্ত সাগরে ভাসার কারণে খাবার ও পানির টান পেয়ে অনেকেই প্রাণ হারান।

আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনপথ না থাকায় মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ লুটপাটের পথে নামছে—এর মূল্য অনেকেই জীবন দিয়ে চুকাতে হচ্ছে। আইওএম জানায়, ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে ৩৩ হাজার ৪৫০-এর বেশি অভিবাসী মারা গেছে বা নিখোঁজ রয়েছে; শুধু চলতি বছরই মধ্য ভূমধ্যসাগরে অন্তত ৭২৫ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন। ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী সংস্থা ও মাইগ্রেন্ট ইনফো বলেছে, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে ভূমধ্যসাগর পথে ৩ হাজার ৩৯৫ জন অবৈধ অভিবাসী ইউরোপে পৌঁছিয়েছে এবং একই সময়ে প্রায় ৬৬০ জন প্রাণ হারিয়েছে।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ও অন্যান্যের হিসাব বলছে, বছরে লিবিয়া থেকে সাগরপথে ইউরোপ যেতে গিয়ে প্রায় ৫০০ জন বাংলাদেশি মারা যান; বাস্তব সংখ্যা সম্ভবত এর বেশি। অভিযোগ আছে—দালাল ও মানব পাচারকারী চক্র কুখ্যাতভাবে সক্রিয় এবং মোটা অংকের নগদ লেনদেনের কারণে অপরাধ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

দেশীয় প্রতিকারমূলক কার্যক্রমও চলছে। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াছ মিয়া বলেছেন, জেলা থেকে তিনটি উপজেলায় মোট ১২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে; প্রশাসন নিহতদের বাড়ি বাড়ি খোঁজ-খবর নিচ্ছে। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে জেলার জগন্নাথপুর ও দিরাই থানায় দালালদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত সপ্তাহে ন্যায়িক কার্যক্রম হিসেবে দিরাই ও জগন্নাথপুরের নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কয়েকজন দালালের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করা হয়েছে।

মানবপাচারের বেশিরভাগ মামলার তদন্ত করছে সিআইডি; সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. বদরুল আলম মোল্লা জানিয়েছেন, বর্তমানে সিআইডিতে ৯১টি মানবপাচারের মামলার তদন্ত চলছে, যার মধ্যে লিবিয়ায় নির্যাতন ও হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনাও রয়েছে। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘটনার তদন্তও শুরু হয়েছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু মামলায় নাম লেখালেই অভিবাসন চক্র থেমে যাবে না—স্থানীয় সচেতনতা বাড়ানো, বৈধ অভিবাসন ও কর্মসংস্থানের বিকল্প তৈরি, সীমান্ত-পর্যবেক্ষণ ও দালাল-চক্রের আর্থিক স্রোত বন্ধ করা প্রয়োজন। শরিফুল হাসান (ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) বলেছেন, কয়েকটি জেলা থেকেই বারবার ভূমধ্যসাগর রুটটি genutzt হয়ে যাচ্ছে; স্থানীয়ভাবে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বছরের পর বছর সক্রিয় থাকতে হবে, কেবল এক ঘটনা ঘটলে তৎপরতা দেখানোবে না।

এ দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, মানুষ যখন জীবন-জীবিকা আর নিরাপত্তার তাগিদে দূরে চলে যায়, তখন তাদের আশায় আর দালালের লোভে কত রকম বিপদের মুখোমুখি হতে হয়। রাজনৈতিক, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন পথ খোলা না গেলে একই কষ্টকর চিত্র পুনরাবৃত্তি হওয়াই স্বাভাবিক।

পোস্টটি শেয়ার করুন