বৃহস্পতিবার, ২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৩০ বছর পর দেশে ফিরলেন নিখোঁজ প্রবাসী আমির হোসেন

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার দিনারা গ্রামের ৬ সন্তানের পিতা আমির হোসেন ৩০ বছর পর পরিবারের ঘরে ফেরেছেন — ফিরে আসায় পরিবার আবেগে আপ্লুত। ১৯৯৬ সালে পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় মালয়েশিয়ায় গিয়ে তিন বছর পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও অর্থ পাঠিয়েও হঠাৎ করে ২৭ বছর ধরে নিখোঁজ ছিলেন তিনি।

ছয় মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও দেখে তার স্ত্রী রোকেয়া বেগম স্বামীর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। ভিডিওতে দেখা যায়, মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের একটি জঙ্গলে ছোট্ট টিনের ঘরে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় থাকা ব্যক্তিকে স্থানীয় প্রবাসী দীপু ও প্রবাসী সাংবাদিক বাপ্পি কুমার দাস উদ্ধার করে ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করেছিলেন। সেই ভিডিও দেখে পরিবারের সদস্যরা তাকে চিনে যোগাযোগ করেন এবং বেশ কিছু ভিডিও কলের মাধ্যমে কথা বলার পর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাসের সাথে নড়িয়া উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে তথ্য যাচাই করে চামটা ইউনিয়ন পরিষদ জন্মনিবন্ধন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠায়। দূতাবাস থেকে ট্রাভেল পাস জারি করে গত মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) গভীর রাতে রাত ১২টা ২০ মিনিটে তিনি ঢাকায় পৌঁছান। বিমানবন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) ও প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহায়তায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও পরিবারের সদস্যরা তাকে গ্রহণ করেন।

বিমানবন্দর থেকে পরিবারের সঙ্গে কেরানীগঞ্জের শহীদুল ইসলামের বাড়িতে নিয়ে গেলে সেখানে বিশ্রাম নিচ্ছেন তিনি। খবর পেয়ে রোকেয়া বেগম ঢাকায় ছুটে এসে স্বামীকে দেখে আবেগতাড়িত হয়েছেন। রোকেয়া বেগম বললেন, ‘‘ছয় সন্তান রেখে তিনি মালয়েশিয়ায় যান। প্রথম তিন বছর নিয়মিত টাকা পাঠিয়েছেন, তারপর হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ২৭ বছর ধরে খুঁজেছি, কোনো খোঁজ মেলেনি — বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন তাও জানতাম না। ছয় মাস আগে যেদিন সেই ভিডিও দেখেছি, তখনই মনে হয়েছে তিনি আমাদেরই। স্বামীকে ফিরে পাওয়া আমার জীবনের এক বিস্ময়কর ঘটনা।’’

পরিবার সূত্রে জানা যায়, আমির হোসেনের বড় ছেলে তিন বছর আগে মারা গেছেন। তিন মেয়ে বিয়ে করে শ্বশুর বাড়িতে; বেঁচে থাকা দুই ছেলে ঢাকায় শ্রমিকের কাজ করেন ও কেরানীগঞ্জে ভাড়া বাড়িতে থাকেন।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান এ ঘটনাকে প্রবাস জীবন ও তার অনিশ্চয়তার জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘‘এমন একজন মানুষ দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকলে পরিবার কত কষ্টে থাকে, তা বোঝা যায়। প্রবাসী সমাজের মধ্যে যারা আছেন, তাদের খোঁজ রাখা জরুরি। প্রযুক্তির এই যুগে প্রতিটি প্রবাসীর ডাটাবেজ রাখা সম্ভব এবং তা অতি প্রয়োজনীয়।’’

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল কাইয়ুম জানান, ‘‘পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য যাচাইয়ের পর দূতাবাসকে কাগজপত্র পাঠানো হয়। সেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফেরত আনতে সহায়তা করা হয়েছে। তিনি এখন পরিবারের কাছে আছেন এবং উপজেলা প্রশাসন যে কোনো সমাধানে পাশে থাকবে।’’

তিন দশক পর এনে দেয়া এই মিলন শুধু এক ব্যক্তির নয়, সমগ্র পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার সমাপ্তি। সরকারের, বেসরকারি সহায়তা ও প্রবাসী সমাজের সহযোগিতায় মিলনের মুহূর্তটি দুর্নিবার হয়ে থাকবে পরিবারটির স্মৃতিতে।

পোস্টটি শেয়ার করুন