সোমবার, ২৭শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনে সম্ভাব্য পতন, খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে

বর্তমান বিপণন মৌসুমে বিশ্বব্যাপী শস্য ফলন রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে; তবু ২০২৬-২৭ মৌসুমে তা প্রায় ২% কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক শস্য পরিষদ (আইজিসি)। আইজিসির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সারের মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ-অস্থিরতা এবং কৃষকদের আবাদের সিদ্ধান্ত বদলাকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই উদ্বেগের তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে ওয়ার্ল্ড-গ্রেইন ডটকমের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে গম ও ভুট্টাসহ প্রধান শস্যগুলোর উৎপাদন গত বছরের তুলনায় প্রায় ৬% বাড়তে পারে এবং মোট উৎপাদন দাঁড়াতে পারে ২৪৭ কোটি ৪০ লাখ টনে। এর মধ্যে গমের ফলন প্রায় ৮৪ কোটি ৫০ লাখ টন এবং ভুট্টার উৎপাদন প্রায় ১৩২ কোটি ৪০ লাখ টনের নতুন রেকর্ড স্পর্শ করতে পারে। এই সুসংবাদ থাকা সত্ত্বেও সংস্থাটি সতর্ক করে বলছে যে পরের মৌসুমে সারের উচ্চমূল্য এবং ক্রয়ক্ষমতা সংকট অনেক অঞ্চলে আবাদ কমিয়ে দিতে পারে।

বিশেষত দক্ষিণ গোলার্ধের কিছু দেশে সার সংগ্রহ বা সরবরাহে অনিশ্চয়তা বাড়ায় কৃষকরা প্রয়োজনীয় সার নিতে বা ব্যবহার করতে অনীহা করতে পারেন, যা সরাসরি বপন ও ফলনে নেতিবাচক প্রতিফলন ফেলতে পারে। এমন অবস্থায় নির্দিষ্ট অঞ্চলের ফলন কমে গেলে বৈশ্বিক যোগান-চেইনেও চাপ পড়তে পারে।

আইজিসি জানিয়েছে, যদিও ২০২৬-২৭ মৌসুমে উৎপাদন কমতে পারে, তবু সেটি ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকবে — মোট প্রাক্কলিত উৎপাদন প্রায় ২৪১ কোটি ৪০ লাখ টন। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী শস্যের চাহিদাও টানা চতুর্থ বর্ষে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু বৃদ্ধির গতিটি আগের বছরের তুলনায় ধীর হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও গম ও ভুট্টার বাণিজ্য প্রায় ৪৪ কোটি ৮০ লাখ টনে স্থিতিশীল থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

উৎপাদনে সামান্য পতনের খবরের মাঝে সয়াবিনকে নিয়ে ইতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছে আইজিসি; আবাদি জমির বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে ২০২৬-২৭ মৌসুমে সয়াবিনের ফলন রেকর্ড করে প্রায় ৪৪ কোটি ১০ লাখ টন হতে পারে।

বাজার মূল্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বেশিরভাগ শস্যের দাম সাম্প্রতিক সময়ে ঊর্ধ্বগামী। আইজিসি-র শস্য ও তৈলবীজ মূল্যসূচক গত এক মাসে প্রায় ১% বেড়েছে, যেখানে চালের দাম প্রায় ৫% বাড়েছে। বার্ষিক ভিত্তিতে সয়াবিনের দাম বাড়েছে ৯% এবং বার্লির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪.২%।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে শস্য উৎপাদন হ্রাস ও সারের মূল্যবৃদ্ধি আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে। বাংলাদেশের মতো দেশে এই বৈশ্বিক ওঠানামা সরাসরি স্থানীয় বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়াতে এবং মজুদ ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে দুর্বল ক্রয়ক্ষমতার ভোগীদের ওপর চাল ও গমের মূল্যবৃদ্ধি অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে ফিরে আসতে পারে।

আইজিসি ও বাজার পর্যবেক্ষকেরা নির্দেশ করছেন যে, বর্তমান অনিশ্চয়তার মধ্যে সরকারি মজুদ ও নীতিগত সমন্বয়, সারের বৈশ্বিক সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদেরকে সহায়তা দেওয়া জরুরি, যাতে সম্ভাব্য সরবরাহ ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতি থেকে সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা যায়।

পোস্টটি শেয়ার করুন