সোমবার, ২৭শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গোয়ালন্দে অকালীন পদ্মা ভাঙন: কৃষিজমি ও বসতবাড়ি বিলীন হওয়ার ভয়ে অতর্কিত উদ্বেগ

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের কাওয়ালজানি ও মুন্সিবাজার এলাকায় অসময়ে পদ্মার তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। রাত-বিরাতে নদীর ধার বদলে যাওয়ায় স্থানীয়রা নিশ্ছিদ্র ঘুম হারিয়েছে, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে। ইতিমধ্যেই বিস্তীর্ণ কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এবং ভাঙন ক্রমান্বয়ে এলাকাগুলো মানচিত্র থেকেও উধাও হয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর ভাঙন শুরু হলে জিওব্যাগ ফেলা হয় — তবে তা জরুরি ক্ষতি ঠেকাতে অকালে কার্যকর হয় না। সাধারণত আগে থেকেই ৫০–৬০ বিঘা জমি নদীতে হারিয়ে যায়। এভাবে বহু পরিবার তাদের ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার বাধ্যবাধকতার মুখে পড়েছে। এখানকার মানুষদের আবেদন, এখনই যদি দীর্ঘমেয়াদি রুখে দেওয়ার উদ্যোগ না নেওয়া হয় তাহলে আরও বেশি ঘরবাড়ি ও আয়ের উৎস বিলীন হবে।

কয়েক বছর আগে বহু আলোচিত দৌলতদিয়া ঘাট আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় ছয় কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ী নদীতীর রক্ষা করার পরিকল্পনা থাকলেও প্রায় সাত বছরেও এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। এর ফলে দেবগ্রাম ইউনিয়নে দীর্ঘদিনের ভাঙন সমস্যা এখন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

সাম্প্রতিক ভাঙনে প্রায় ১০ বিঘা কৃষিজমি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের লাগামছাড়া গতিতে বেথুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, কবরস্থান, বাজার, ঈদগাহ ও কয়েকশ’ বসতঘর ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ভাঙন পরিদর্শনে নদীর তীরে ভিড় করেন বহু স্থানীয়, তাঁদের চোখে-মুখে উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট দেখা যায়। সবাইর ধরে রাখা দাবি — পদ্মার ভাঙন রোধে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া হোক, তবেই বসতভিটা ও জীবিকা সংরক্ষিত হবে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক জুলহাস সরদার ও কুদ্দুস সরদার জানান, “আমার বাপের ১০০ বিঘা জমি ছিল। ক্রমান্বয়ে নদীতে বিলীন হয়ে এখন মাত্র ছয় ভাই মিলে ছয় বিঘা জমি পেয়েছি। ওই এক বিঘা জমিতেই আমরা সংসার চালাই, ছেলে-মেয়েদের খাওয়াও-দাওয়া চালাতে হয়।” তাদের বক্তব্যে ব্যক্তিগত বিপর্যয় ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কষ্ট মিশে আছে।

অন্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক খবির সরদার ও লোকমান সরদার বলেন, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে কাওয়ালজানি ও মুন্সিবাজারের ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় ৫০ ফুট এলাকাজুড়ে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে প্রায় তিন কাঠা ধানের জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এবং পেঁয়াজসহ অন্যান্য ফসলি জমিও ধসে যাওয়ার হুমকিতে রয়েছে। তারা আশঙ্কা করেন, যেকোনো সময় এসব জমি সম্পূর্ণভাবে নদীর সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস বলেন, “অসময়ের এই ভাঙনে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। দ্রুত পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাজমিনুর রহমান জানান, ইতোমধ্যে একটি টিম ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। যদি কোনও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঝুঁকিতে থাকে, জরুরি ভিত্তিতে সেখানে কাজ করা হবে।

স্থানীয়রা চান শুধু সংকটকালীন আচ্ছাদন নয় — স্থায়ী, প্রযুক্তিভিত্তিক নদীতীর রক্ষা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করে তাদের বসতভিটা ও জীবিকা রক্ষা করা হোক। অবিলম্বে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে জেলার এই অংশের ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন