ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের নতুন ধারাকে ঘিরে একীভূত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকে আগের মালিকদের কর্তৃত্ব ফিরে পাওয়ার সম্ভাব্যতায় আমানতকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিভ্রান্তির ফলে অনেক আমানতকারী নতুন করে টাকা তুলছেন; কেউ কেউ কোনো মুনাফা না নিয়ে কেবল মূল টাকা ফেরত চাইছেন।
এই পরিস্থিতিতে ওই পাঁচ ব্যাংকে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকরা একীভূতকরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে কি না—এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে লিখিতভাবে স্পষ্ট নির্দেশনা চেয়েছেন। গত রোববার তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বুকিং বৈঠকে বর্তমান পরিস্থিতি বিস্তারিত তুলে ধরেন।
পটভূমি: কেন্দ্রীয় সরকার গত বছর ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী শরীয়াহভিত্তিক এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামিক ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে। এই একীভূতকরণ কার্য সম্পন্ন করতে গত নভেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচজন প্রশাসক ও তাদের সহায়তায় প্রতি প্রশাসকের জন্য চারজন করে কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এ ১৮(ক) ধারা যোগ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, একীভূত ব্যাংকে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যে অর্থ দিয়েছে, তার সাড়ে সাত শতাংশ (৭.৫%) দিয়ে আগের মালিকরা নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের প্রস্তাব পেশ করতে পারবেন—যা আমানতকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এক্সিম ব্যাংকের আগের নিয়ন্ত্রক ছিলেন নাসা গ্রুপের নজরুল ইসলাম মজুমদার, অন্য চারটি ব্যাংক কার্যত চলছিলেন এস আলম গ্রুপের অধীনে।
বৈঠকে প্রশাসকরা জানায়, এই পাঁচ ব্যাংক থেকেই দীর্ঘদিন আমানতকারীরা সরাসরি টাকা তুলতে পারছিলেন না। একীভূত করে সরকারি মালিকানার ঘোষণা দিলে কিছুটা আস্থা ফিরেছিল। কিন্তু এরপর ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানালে প্রত্যাশাভঙ্গ দেখা দেয়। পরে মাইলফলক হিসেবে ৪ শতাংশ হারে মুনাফা দেওয়া ঘোষণা পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করলেও নতুন আইনের সেই ধারাটি আবারও আগের মালিকদের ফিরে আসার সম্ভাবনার সূত্র ধরায় উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ফলত আমানতকারীরা নিয়মিতভাবে টাকা উত্তোলনের চাপ দিচ্ছেন এবং অনেকে প্রাথমিক ‘হেয়ারকাট’ মেনে নিয়ে কেবল মূল টাকা ফেরত চাচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, দুর্বল অবস্থায় থাকা এই পাঁচটি ব্যাংকে বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ হিসেবে মোট ৪৭ হাজার ৮৪ কোটি টাকা দিয়েছে। একীভূত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মূলধনে সরকার সরাসরি যোগান দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে প্রতিটি আমানতকারীকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দিতে মোট ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
আর্থিক দিকটিও উদ্বেগজনক: গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণ ছিল এক লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা খেলাপি—অর্থাৎ মোট ঋণের ৮৪.২৩ শতাংশ। একই সময়ে পুরো ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩০.৬০ শতাংশ। ২২টি ব্যাংকের সর্বমোট মূলধন ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে এই পাঁচ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এক লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।
এক্ষেত্রে প্রশাসকরা চান—সুচিন্তা ও বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক লিখিতভাবে নিশ্চিত করবে যে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে এবং আমানতকারীদের নিরাপত্তা ও সুস্পষ্ট নীতি বজায় থাকবে। এমন স্পষ্ট বার্তা না পেলে প্রশাসকরা জানান, আমানতকারীদের ভরসা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে এবং তাতে আর্থিক অস্থিরতা বাড়তে পারে।