রবিবার, ১৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কোরবানির পশু থেকে মানুষে ছড়াতে পারে প্রাণঘাতী রোগ, সতর্ক করলেন বাকৃবি অধ্যাপক

পবিত্র ঈদুল আজহার আগে-পরেই দেশজুড়ে কোরবানির পশুর হাট জমে উঠে। কিন্তু এই সময় গবাদি পশুর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু সংক্রামক রোগ মানুষের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে অ্যানথ্রাক্স (তড়কা) ও ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ (খুরা)—এই ধরনের জুনোটিক রোগ সম্পর্কে বাড়তি সতর্কতা জরুরি বলেই সতর্ক করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আমিমুল এহসান।

তিনি বলেন, ‘‘কয়েক দিন আগে রংপুর ও গাইবান্ধায় অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত মানুষের মধ্যে চামড়ায় ক্ষত, চোখ ফোলা ও অন্যান্য লক্ষণ দেখা গেছে। অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত প্রাণীর রক্ত, মাংস বা দেহের অংশের সংস্পর্শে এলে মানুষও সংক্রমিত হতে পারে। হাটে যদি কোনো আক্রান্ত পশু থাকে, সেখানে থেকেই রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে নিয়মিত পশু টিকাদান ও হাটে প্রবেশপথে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।’’

অধ্যাপক বলেন, ‘‘অ্যানথ্রাক্সে অনেক সময় পশু লক্ষণ দেখানোর আগেই মারা যায়। লক্ষণ দেখা দিলে সাধারণত শরীরের তাপমাত্রা ১০৪–১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট (প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পর্যন্ত উঠতে পারে এবং দ্রুত মৃত্যু ঘটে। মৃত পশুর নাক, মুখ ও পায়ুপথ থেকে কালচে‑রক্ত বের হয়; সেই রক্তের সংস্পর্শে বা বাতাসে পৌঁছলে জীবাণু স্পোর তৈরি করে, যা দীর্ঘ সময় সংক্রমণ ছড়াতে পারে। জিহ্বা, নাক বা গলায় কালচে বা সাদা দাগ, ফোসকা দেখা যেতে পারে। আচরণগতভাবে অস্বাভাবিক উত্তেজনা বা আলাপত্যও লক্ষ করা যায়।’’

কোরবানির পশুদের মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের পাশাপাশি ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ বা খুরা রোগও ব্যাপকভাবে ছড়াতে পারে। তিনি বলেন, ‘‘খুরা অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং বাতাসের মাধ্যমে দীর্ঘ দূরত্ব পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। কোরবানি মৌসুমে এটি মহামারির আকার ধরতে পারে। কোনো অঞ্চলের আক্রান্ত গরু যদি বিক্রির জন্য অন্য অঞ্চলে আনা হয়, তবে পুরো পথজুড়ে এবং আশপাশের পশুদের মধ্যে জীবাণুটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই কোনো অসুস্থ পশুকে হাটে বা ট্রাকে নেওয়া উচিত না; প্রথমে ভেটেরিনারির কাছে সঠিক চিকিৎসা করিয়ে তারপর কোরবানির জন্য বাছাই করবেন।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘কোরবানির পরে অনেক পশু অবিক্রিত থেকেই বাড়ি ফিরতে পারে। এসব পশু হাটে এসে আক্রান্ত হলে পরে নিজ এলাকায় গিয়ে অন্য সুস্থ পশুকে সংক্রমিত করতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে ফুট অ্যান্ড মাউথ সংক্রামিত হলেও সাধারণত অ্যানথ্রাক্সের মত মারাত্মক জটিলতা দেখা না গেলেও সতর্ক থাকা জরুরি।’’

হাটে যাওয়া ক্রেতাদের জন্য তিনি কিছু নির্দেশও দিয়েছেন—অসুস্থ মনে হলে পশু স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন; বিশেষত যদি আপনার শরীরে কোনো ক্ষত বা কাটা থাকে সেটা ঢেকে হাটে যান; পশু স্পর্শের পরে দ্রুত সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ও পা পরিষ্কার করবেন।

হাট কর্তৃপক্ষকেও তিনি সতর্ক করেছেন—হাটে বর্জ্য ও রক্ত যেন যত্রতত্র না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কোরবানির পরে পশুর অবশিষ্টাংশ নিরাপদ স্থানে পুঁতে ফেলা এবং মাংস ভালভাবে রান্না করা অপরিহার্য। সন্দেহজনক কোনো পশু হাটে দেখা দিলে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা ভেটেরিনারির সঙ্গে তৎক্ষণাৎ যোগাযোগ করার আহ্বান জানান তিনি।

সংক্ষেপে, সজাগতা, নিয়মিত টিকাদান, হাটে স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও বর্জ্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা মেনে চললেই ঈদের সময় zoonotic রোগের ঝুঁকি যথেষ্ট কমানো সম্ভব—এমনটাই জানালেন ড. আমিমুল এহসান।

পোস্টটি শেয়ার করুন