মঙ্গলবার, ১৯শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুষ্টিয়ায় পীর হত্যার মামলার তাকে গ্রেপ্তারভয়ে স্কুলছাত্র আত্মহত্যা

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে কোরআন অবমাননার অভিযোগের পর পীর পরিচিত আব্দুর রহমান শামিম (৬৫)কে পিটিয়ে ও কোপিয়ে হত্যার মামলার পর থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়েই এক স্কুলছাত্র আত্মহত্যা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিহত ছাত্র টানা শঙ্কা ও মানসিক দুর্বিষহতায় আত্মহত্যা করেছেন—তার নাম স্থানীয়ভাবে লাম। তিনি পিএসএস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র ও রবিউল ইসলামের ছেলে।

পুলিশ ও স্থানীয়দের বরাতে জানা যায়, গত ১১ এপ্রিল উপজেলার ফিলিপনগরের শামিমের আস্তানায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার সময় তাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর দায়ের হওয়া মামলায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পরিবার জানায়, নিহত লামের বড় ভাই আলিফ ইসলামকে (কাগজে বয়স ১৮, স্থানীয়ভাবে ২৩) ঘটনাস্থলে থাকার ভিডিও ফুটেজ দেখে পুলিশ শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে। আলিফ গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই পরিবারের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং ছোট ভাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরিবারের সদস্যদের কথায়, ঘটনার দিন লাম কেবল ঘটনাস্থল দেখতে গিয়েছিল, সরাসরি কোনো উত্তেজনায় অংশগ্রহণ করেনি।

লামের পরিবারের দাবি অনুযায়ী, গ্রেপ্তার আতঙ্কই তার আত্মহত্যার মূল কারণ। শনিবার (১৬ মে) দুপুরে আশুলিয়া থানাধীন খালার ভাড়া বাসায় লাম গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। রোববার (১৭ মে) ময়নাতদন্তের পর রাত ১১টার দিকে ফিলিপনগরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

নিহতের পিতা রবিউল ইসলাম বলেন, “আমার ছেলে আলিফের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, তা ঠিক নয়। ভিডিও ফুটেজ দেখিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লাম মাত্র নিজের মতো ছোট-বড় হত; হয়তো সেই ভয় ও দুশ্চিন্তা থেকেই এমন করলো।” তিনি আরও বলেন, “আমি তো এক ছেলে হারালাম। যদি প্রশাসন নিঃসন্দেহে কাদের দায় নেই তা দেখে আলিফকে ছেড়ে দিত, আমরা কৃতজ্ঞ থাকতাম।” রবিউল বলেন, আলিফের জন্মনিবন্ধনে বয়স ১৮, তবু স্থানীয়ভাবে তাকে ২৩ দেখানো হয় এবং সে বাজারে সবজি বিক্রি করত।

মামলায় গ্রেপ্তার চার আসামির মধ্যে এজাহারভুক্ত রাজীব মিস্ত্রিকে দুই দিন এবং বিপ্লব হোসেন (২৬) ও আলিফ ইসলামকে এক দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানায়, রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে।

তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল ফিলিপনগর এলাকার শামিমের আসতানাটি উচ্ছেদ ও তার কার্যক্রম বন্ধ করা। ঘটনার পরিকল্পনা অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকেই করা হয় বলে তাদের প্রাথমিক চিত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পুরনো ভিডিওর অংশ ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরির পরে জনতা শামিমের আসতানায় হামলা চালায়; তখন লুটপাট ও অগ্নিসংযোগও করে। তদন্তকারীরা বলছেন, হামলায় অংশ নেওয়া অংশগুলোর মধ্যে কেউ কেউ কেবল ভাঙচুর ও উচ্ছেদে জড়িত ছিল, আবার আর কেউ সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়।

তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না; তবুও পুলিশ জানিয়েছে, হামলায় নেতৃত্বদানকারী ও জড়িত অন্তত ৩৫ জনের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তার করা হলে ঘটনাটির পেছনের বিস্তারিত কারণে আরও স্পষ্টতা আসবে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।

ভেড়ামারা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন জানান, “আলিফের ছোট ভাই লামের আত্মহত্যার খবর শুনেছি। কেউ ভয় থেকে আত্মহত্যা করলে পুলিশ সেখানে কিছুই করতে পারে না। তবে হামলা ও ভাঙচুরে লামের সংশ্লিষ্টতা ছিল—ভিডিও ফুটেজ দেখে আলিফকেও শনাক্ত করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।”

উল্লেখ্য, নিহত শামিমের বড় ভাই ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ফজলুর রহমান গত ১৩ এপ্রিল দৌলতপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় জেলা শিবিরের সাবেক সভাপতি খাজা আহম্মেদ ও খেলাফত মজলিসের উপজেলা সভাপতি আসাদুজ্জামানসহ চারজনকে নাম লেখানো হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা করে আরও ১৮০-২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশের তৎপরতা ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন