মঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৭৯তম কান উৎসবে স্বর্ণপাম জিতল রোমানীয় ছবি ‘ফিওড’

৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে সর্বোচ্চ সম্মান স্বর্ণপাম জিতেছে রোমানিয়ান পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান মুঙ্গিউর চলচ্চিত্র ‘ফিওড’। উৎসবের সমাপনী দিনে কোরিয়ান নির্মাতা পাক চান-উক ঘোষণা করেন এই বিজয়ী ছবির নাম। ২০০৭ সালে ‘‘4 Months, 3 Weeks and 2 Days’’ ছবির জন্য স্বর্ণপাম জেতা মুঙ্গিউ এখন দ্বিতীয়বার এই মর্যাদাসম্পন্ন পুরস্কার পেলেন। পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি ‘ফিওড’-কে সহনশীলতা, অন্তর্ভুক্তি ও সহমর্মিতার গল্প হিসেবে বর্ণনা করে এই মানবিক মূল্যবোধগুলো বাস্তব জীবনে প্রয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

‘ফিওড’ গল্পের কেন্দ্রবিন্দু নরওয়ের একটি ছোট গ্রামে নতুন করে জীবন শুরু করা এক রোমানিয়ান পরিবার। ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল পরিবারের ওপর হঠাৎ করে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে এবং রাষ্ট্র তাদের সন্তানদের হেফাজতে নিয়ে যায়। ছবিটি নরওজিয়ান সমাজের প্রগতিশীল ছাপের আড়ালে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কীভাবে তৈরি হয়—তা সূক্ষ্ম এবং তীক্ষ্ণভাবে তুলে ধরে। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন সেবাস্তিয়ান স্ট্যান ও রেনাতে রেইনসভে; তাদের অভিনয় দেখার সময় দর্শক হলে তীব্র আবেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে। সমালোচকরাও মনে করেন, উভয়ভাবে উদারনৈতিক সমাজের ভণ্ডামি ও বহির্মুখী নীতির প্রশ্ন উত্থাপন করার সাহসী ছবি ‘ফিওড’।

উৎসবের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মান গ্রাঁ প্রি জিতেছে রুশ নির্মাতা আন্দ্রেই জভিয়াগিনতসেভের ছবি ‘মিনোটর’। রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে একজন নির্মম ব্যবসায়ীর পারিবারিক সংকটের গল্প তুলে ধরেছে এটি। বর্তমানে ফ্রান্সে নির্বাসিত এই পরিচালক পুরস্কার নিতে এসে যুদ্ধবিরতি ও সহিংসতা থামানোর আহ্বান জানিয়ে আবেগঘন ভাষণ দেন।

একাধিক অভিনয় বিভাগের পুরস্কার এবার যৌথভাবে প্রদেয় হয়—জাপানি অভিনেত্রী তাও ওকামোতো ও ফরাসি অভিনেত্রী ভার্জিনি এফিরা রিউসুকে হামাগুচির ‘অল অব আ সাডেন’ ছবির জন্য সেরা অভিনেত্রীর সম্মান ভাগাভাগি করেন। সেরা অভিনেতার পুরস্কারও যৌথভাবে গিয়েছিল লুকাস দন্তের ‘কাওয়ার্ড’ ছবির দুই অভিনেতা মাক্কিয়া ও ভ্যালোঁতাঁ কাম্পানির মধ্যে।

অন্যান্য বিভাগের পুরস্কারেও ছিল বৈচিত্র্য: ভ্যালেস্কা গ্রিসবাখ ‘দ্য ড্রিমড অ্যাডভেঞ্চার’-এর জন্য জুরি পুরস্কার পান। সেরা পরিচালকের স্বীকৃতি পেয়েছেন পাওয়েল পাভলিকোভস্কি, পাশাপাশি স্প্যানিশ জুটি হাভিয়ের আমব্রোসি ও হাভিয়ের কালভো করায় যৌথভাবে সম্মাননা দেওয়া হয়। ইরানের রাজনৈতিক দমন-পীড়নের ওপর নির্মিত পেগাহ আহাঙ্গারানির ‘রিহার্সালস ফর আ রেভোল্যুশন’ শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়। রুয়ান্ডার ইতিহাসে প্রথমবার কোনো চলচ্চিত্র হিসেবে মেরি-ক্লেমেন্টিন দুসাবেজাম্বোর ‘বেন ইমানা’ ক্যামেরা দ’অর জিতে নেন; তিনি এই পুরস্কারটি তার দেশের নারীদের উৎসর্গ করেছেন।

কান উৎসব এবারের ফোরামে চলচ্চিত্রের বাইরেও বিতর্ক ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। মূল প্রতিযোগিতার ২২টি ছবির মধ্যে মাত্র পাঁচটি নারী পরিচালিত হওয়ায় নারী প্রতিনিধিত্বের অভাব নিয়ে সমালোচনা ওঠে—কয়েকজন তারকা, যারা মঞ্চে বক্তব্য রাখেন, এই ইস্যুতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এছাড়াও হলিউড বড় স্টুডিওগুলোর অনুপস্থিতি এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নিয়ে নানা বিতর্ক ফুঁটে ওঠে। গত ১২ মে থেকে শুরু হওয়া এই উৎসব জুড়ে জন ট্রাভোল্টা ও কেট ব্লাঞ্চেটের মতো তারকাদের উপস্থিতি থাকলেও এবারের মূল আকর্ষণ ছিল জীবনমুখী ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন স্বাধীন চলচ্চিত্রগুলো, যেগুলো দর্শক ও সমালোচকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলেছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন