সোমবার, ১লা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১০ লাখ কম কোরবানির পশু, খামারিরা বড় ক্ষতির মুখে

উচ্চ মূল্যস্ফীতির তীব্রতায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হওয়ায় এবারের কোরবানির বাজারে সরাসরি প্রভাব পড়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ও মাঠ পর্যায়ের প্রত্যাশার তুলনায় অন্তত ১০ লাখ কম পশু কোরবানি হওয়ায় খামারি, চাষি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক সমস্যায় পড়েছেন। কৃষি অর্থনীতিবিদদের প্রাথমিক হিসাব অনুসারে সরকার যা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল—১ কোটি ১ লাখ পশু—তার তুলনায় বাস্তবে কম কোরবানি হয়েছে। এতে অনেক খামারে পশু অবিক্রীত থেকে ফিরে এসেছে এবং লোকসানের চাপ বেড়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী এ বছর পর্যায়ক্রমে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত ছিল। সরকারি এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে, তবে মাঠে পাওয়া চিত্র বলছে উদ্বৃত্তের পরিমাণ এই পূর্বাভাসের চেয়েও অনেক বেশি। মাঠ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ এখনো চলছে, তবু প্রাথমিক পরিসংখ্যান এক মানসিকভাবে হতাশাজনক চিত্র ফুটিয়ে তুলছে।

বিভাগীয় ভিত্তিতে দেখা গেলে ময়মনসিংহ, খুলনা ও রংপুরে কোরবানির চাহিদার তুলনায় পশু কোরবানির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চট্টগ্রাম ও বগুড়া জেলাতেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য, খাবার ও ওষুধের দামের উর্ধ্বগতি এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতা সংকটের মুখে অনেক খামারি শেষ মুহূর্তে লোকসান মেনে পশু বিক্রি করেছেন অথবা পুরোটাই অবিক্রীত রাখা বাধ্য হয়েছেন।

গত এক দশকে মাংসের দর অনেক বেড়েছে—২০১৪ সালে যেখানে গরুর মাংসের দাম ছিল প্রায় ২৭৫ টাকা/কেজি, এখন সেটি ৮০০–৮৫০ টাকার মধ্যে উঠেছে। খাসির মাংসও অনেকের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ২০১৫ সালে ভারত থেকে গরু আমদানী বন্ধ হওয়ার পর দেশে ডেইরি খাতে কিছু পরিবর্তন এসেও তা বাজার স্থিতিশীল রাখতে যথেষ্ট হয়নি। টাকার অবমূল্যায়ন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত অগ্রাধিকার বদলে শরিক বা ভাগে কোরবানি দিচ্ছেন, আবার অনেকে আর্থিক সমস্যার কারণে কোরবানিই বাদ দিয়েছেন।

ইতিহাস ভাবলে দেখা যায় রাজনৈতিক অস্থিরতা, মহামারি বা অর্থনৈতিক মন্দার সময়গুলোতে কোরবানির পশুর সংখ্যা কমে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে রেকর্ড ১ কোটি ৬ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে সেই রেকর্ড পুনরাবৃত্তি হয়নি। প্রাণিসম্পদ অধিদফতর বলছে সরবরাহ পর্যাপ্তই আছে বলে পশু উদ্বৃত্ত হচ্ছে; বিশ্লেষকদের মতে বাস্তবে চাহিদাই সংকুচিত হয়েছে।

কোরবানির পর চামড়া সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও আছে—বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ইতোমধ্যে ৫৬ লাখের বেশি পশুর চামড়া প্রাথমিকভাবে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে। সরকার আধুনিক কসাইখানা স্থাপন, ট্যানারি শিল্পের পরিবেশগত মান উন্নয়ন ও প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে চামড়া শিল্পকে আধুনিকায়ন করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়াতে উদ্যোগ গ্রহণ করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে বড় আর্থিক ঝুঁকি এড়াতে শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়—মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ও বাজারের যৌক্তিক চাহিদাকে মাথায় রেখে জাতীয় পরিকল্পনা ও নীতিমালা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তা না হলে কেবল খামারিরাই নয়, সঙ্কুচিত চাহিদার কারণে সম্পূর্ণ ভুক্তভোগী সার্পসিস্টেম—কসাইখানা, পরিবহন ও প্রসেসিং খাত—সবাইই প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়বে।

পোস্টটি শেয়ার করুন