এক নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন ও বাজেট অধিবেশন শুরু হচ্ছে রোববার, ৭ জুন। বিকাল ৩টায় সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের আহ্বানে এই অধিবেশন শুরু হবে। আগামী ১১ জুন অনুষ্ঠিত হবে নতুন অর্থবছর ২০২৬-২৭’র জন্য প্রস্তাবিত বাজেট পেশের কার্যক্রম, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উপস্থাপন করবেন। এটি হবে চলমান সরকারের প্রথম পুরো বাজেট, যা গত নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক মাইলফলক।
বাজেটের সম্ভাব্য আকার এ বছর ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা থেকে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে থাকতে পারে, যদিও প্রাথমিক অঙ্কে কিছু কিছু প্রাক্কলনে এর পরিমাণ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকাও পৌঁছাতে পারে। এই বাজেট অনুমোদিত হলে এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বিশাল অঙ্কের বাজেট হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। মূল লক্ষ্য হলো ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং একটি সমতাসম্পন্ন, বৈষম্যহীন অর্থনীতির ভিত্তি সৃষ্টি।
বর্তমান সরকার বাজেটের মাধ্যমে traditional আমলাতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু স্পষ্ট করেছেন, এবারের বাজেটের মূল দর্শন হলো ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন’, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাগাল অর্থনৈতিক সাফল্যের পৌঁছে দিতে চায়। এই লক্ষ্য পূরণে, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করতে বিভিন্ন প্রকল্প চালু করা হচ্ছে।
বাজেটের মূল রূপরেখা ও লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যাপক বরাদ্দ, পাশাপাশি আধুনিক ও সৃজনশীল শিল্পের প্রসারে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষার উন্নয়নে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ প্রায় ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নতুন বাংলাদেশের মেধাবিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হবে। পাশাপাশি, স্বাস্থ্য খাতে প্রস্তাবিত বাজেটের মাধ্যমে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত ও উন্নত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি প্রকল্প ও বিনিয়োগের চাহিদা বাড়াতে সরকার ‘নিয়ন্ত্রনমুক্ত অর্থনীতি’ ও ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজতর করা হবে। পুঁজিবাজারের উন্নয়নে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে দেশের বিনিয়োগকারীরা আরও বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বাজেটের সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে কার্যকর তদারকি, দক্ষ প্রশাসন ও তৃণমূল পর্যায় থেকে দুর্নীতি রোধের উপর। অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদরা সরকারের এই মানবসম্পদ ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন, তবে তারা সতর্ক করে দিয়েছেন, বাস্তবায়নে দুরূহ চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে, সংসদ ভবনের আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সব ধরনের জনসমাবেশ ও বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। সংসদ অধিবেশন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। এর আগে, ১২ মার্চ দেশের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রথম অধিবেশনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ সংসদ, যা ২৫ কার্যদিবসের মধ্যে ৯৪টি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস ও ১৩৩টি সরকারি অধ্যাদেশ উত্থাপন করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সংসদ ও সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে কড়া নজরদারি ও পরিকল্পনা চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।