বুধবার, ১৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউনূসের ‘কালো অধ্যায়’ পেরিয়ে ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্নের পথচলা

একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো তার বেসরকারি খাত, যা থেকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক উন্নতির পিএনইউর ভিত্তি তৈরি হয়। তবে ড. মুহম্মদ ইউনূসের কেন্দ্রীয় সরকারের দেড় বছরের শাসনকালে আইনি সংস্কারের নামে নেওয়া কয়েকটি সিদ্ধান্তে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গভীর স্থবিরতা সৃষ্টি হয়। বিচারহীনতার সুযোগ নিয়ে সম্পদ অবরুদ্ধ এবং উদ্যোক্তাদের কার্যাবলী বন্ধে যে অন্ধকার অধ্যায় শুরু হয়েছিল, সেটি এখন শেষের পথে। দেশের অর্থনৈতিক খাতের উপর দুর্বিষহ এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ধীরে ধীরে স্বস্তির আভাস দেখা দিয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের পরে ইউনূস আমলের বিতর্কিত আইনি ধারাগুলোর জটিলতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাটিয়ে উঠছে। এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে, দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য একটি স্বপ্ন দেখা হচ্ছে—২০১০ সালের পর বাংলাদেশকে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করা। এই লক্ষ্যে ইতিমধ্যে সরকার ‘থ্রি-আর’ নামে একটি বিশেষ কৌশল জাতির সামনে উপস্থাপন করছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে এই মহাপরিকল্পনা দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মোড় আনতে যাচ্ছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৮.৫ শতাংশে পৌঁছানো। ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বিদেশী সরাসরি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সমৃদ্ধ অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে, এর আগে গত দেড় বছরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ২০০৪ সালের সংশোধনী আইনকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে অভিহিত করেছে বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, আইনের আশ্রয় গ্রহণের অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের স্বাভাবিক অধিকার। দুর্বিসহ এই আইনের মাধ্যমে, বিচারপ্রক্রিয়া আদৌ সঠিকভাবে হয়নি, বরং আদালতের অনুমতি ছাড়াই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সম্পদ বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সরকারি অনুদানের মাধ্যমে ব্যবসা বন্ধের এই ব্যবস্থা ক্ষমতার অপব্যবহার ও ব্যবসায়ীদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে বলে বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করেছেন। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই আইনী পরিস্থিতির কারণে বিশাল ক্ষতি হয়েছে—প্রায় দেড় হাজার শীর্ষ ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাব ও সম্পদ জব্দ, এক হাজারের বেশি উদ্যোক্তার বিদেশ যাওয়া বন্ধ হয়েছে, ফলশ্রুতিতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে লাখো মানুষ চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতিও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে—২০২৩ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টির খেলাপি ঋণ নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। দেশের শীর্ষ ব্যাংকগুলো যেমন সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, উত্তরা ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকেও এই প্রবণতা দেখা যায়। দুর্নীতি ও অর্থ পাচার দমন করার জন্য আন্তর্জাতিকমানের কঠোর আইনি কাঠামো রয়েছে, কিন্তু আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশে আদালতের রায় ব্যতিরেকে ব্যবসা বন্ধের নজির খুবই কম। দেশের অর্থনীতি এখন ফের ঘুরে দাঁড়ানোর পথে—নতুন সরকারের ‘থ্রি-আর’ কৌশল এই পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি। দেড় বছরের আইনি ও নীতিগত ঝড়ঝাপ শেষের দিকে, দেশের অর্থনৈতিক সূচকেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো জানাচ্ছে, গত অর্থ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৪.১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেয়েছে, যা একটি ইতিবাচক দিশায় संकेत করে। সরকার এই ধারাকে আরও ত্বরান্বিত করতে আগামীর পরিকল্পনায় ‘থ্রি-আর’ বা তিন ধাপের নীতিমালা গ্রহণ করেছে। প্রথম ধাপ হলো ‘রিকভারি’ বা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার—অর্থাৎ, আগে যেসব আইনি সমস্যা ও ব্যাংক হিসাব জব্দের কারণে ব্যবসায়ীদের আস্থা ভেঙে গিয়েছিল, সেটি দ্রুত কাটিয়ে উঠা। এর আওতায় অবরুদ্ধ হিসাব ও সম্পদ দ্রুত সচল করা হবে, যাতে অর্থপ্রবাহ স্বাভাবিক হয়। দ্বিতীয় ধাপে ‘রিস্টোরেশন’ বা অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ফিরে আসানো হবে, যেখানে ব্যাংক ঋণ প্রবাহ বাড়ানো এবং বিনিয়োগে উৎসাহ দেয়া হবে। এর মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা এবং শিল্প পুনরায় চালু করে দেশের কর্মসংস্থান ফেরানো হবে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার চূড়ান্ত স্তরে, ‘রিকনস্ট্রাকশন ফোর অ্যাক্সিলারেশন’ বা অর্থনৈতিক গতি বাড়ানোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হবে। এটি পাঁচ বছরব্যাপী একটি বৃহৎ মহাপরিকল্পনা, যা ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। দেশের অবকাঠামোকে আধুনিক, ডিজিটাল ও উৎপাদন কেন্দ্রিক করে গড়ে তুলতে এই প্রবৃদ্ধির জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে, এই পরিকল্পনা দেশকে একটি blom bet বেশি শক্তিশালী আর স্বাবলম্বী অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন