সোমবার, ২৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টাঙ্গাইলের পাঁচ তরুণীর গবেষণা: কলাকে প্রোটিনসমৃদ্ধ ‘সুপারফুড’ বানানোর উদ্যোগ

ইচ্ছা, শ্রম ও মেধার ধারাঁ মিললে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়—এই কথাটাই প্রমাণ করে টাঙ্গাইলের পাঁচ তরুণীর গবেষণা। কুরতুবী মাদরাসার আলিম প্রথম বর্ষের পাঁচ ছাত্রী—ফাতেমাতুজ জহুরা, অনামিকা আলফী আমরি, মিফতাহুল জান্নাত মায়া, মেঘলা আক্তার ও ফারজানা আক্তার—প্রথাগত শিক্ষার বাইরে গিয়ে আধুনিক জীবপ্রযুক্তির ধারণা কাজে লাগিয়ে একটি নতুন সম্ভাবনার দিকে দৃষ্টি বাড়িয়েছেন।

তাদের নিবিড় গবেষণায় তৈরি তাত্ত্বিক মডেলটি কলার স্বাদ অপরিবর্তিত রেখে কলাকে উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ পাল্টে দেওয়ার উপায় তুলে ধরে। গবেষণার উদ্যোগে তারা মসুর ডাল থেকে বেছে নেয় প্রোটিন সংশ্লিষ্ট একটি জিন (ডিএইচডিপিএস) এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ধারণার ওপর ভিত্তি করে কলার জিনে אותו জোড়া লাগানোর রূপরেখা তৈরি করে—একটি রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ মডেল। গবেষণাটি শিক্ষক আরিফুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।

প্রকল্পটির নাম দেয়া হয়েছে: ‘প্রোটিনসমৃদ্ধ কলা তৈরির জন্য কলার ডিএনএ নিষ্কাশন ও রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ মডেল’। ধারণাটি এসেছে ক্লাসরুমের ল্যাব সেশনে—ছাত্রীদের কৌতূহল আর প্রাসঙ্গিক জিজ্ঞাসা থেকেই গবেষণার বীজ গজায়। পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ফলে তারা পরীক্ষামূলকভাবে তাত্ত্বিক মডেল গড়ে তুলতে সক্ষম হন।

এই প্রস্তাবনা যে শুধু কাগজে না থেকে বাস্তব প্রতিযোগিতায় মূল্যায়িত হয়েছে, তার উদাহরণও আছে—টাঙ্গাইল সদর উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বিজ্ঞান মেলায় তারা প্রথম স্থান অধিকার করে; বিভাগীয় পর্যায়ে প্রকল্পটি দ্বিতীয় স্থান পায় এবং পরে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় অংশগ্রহণ করে বিশেষ প্রশংসা অর্জন করে।

দলটির সদস্য অনামিকা আলফী আমরি বলেন, বাংলাদেশ এখনও শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের প্রোটিনঘাটতির সমস্যায় ভুগছে; যদি এই ধরনের উদ্ভাবন মাঠ পর্যায়ে সফলভাবে প্রয়োগ করা যায়, তা হলে তা দেশের পুষ্টি সচেতনতায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মিফতাহুল জান্নাত মায়া যোগ করেন, কলা সহজলভ্য হওয়ায় প্রোটিনসমৃদ্ধ করে দিলে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা মেটাতে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ফাতেমাতুজ জহুরা বলেন, কৃত্রিম সাপ্লিমেন্ট বা রসায়নের ওপর নির্ভর না করে ফল ও ফসলের পুষ্টিগুণ প্রাকৃতিকভাবে বাড়ানো সম্ভব হলে তা নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করবে।

তারা মনে করায় যে, জেনেটিক্যালি মডিফাইড ফসল বাণিজ্যিকভাবে চাষ করলে কৃষকরাও লাভবান হবেন এবং এটি রপ্তানিযোগ্য পুষ্টিকর ফসল হিসেবে দেশে একটি নতুন বাজার খুলে দিতে পারে—এ কথাও তুলে ধরেন মেঘলা আক্তার। একই সঙ্গে এই তরুণীরা স্মরণ করিয়ে দেন কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতার কথাও: উন্নত ল্যাবরেটরির অভাব এবং জিএম প্রযুক্তি নিয়ে সামাজিকভাবে চলমান বিতর্ক।

প্রকল্পের তত্তাবধায়ক শিক্ষক আরিফুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে জানতে চাওয়া ও এক্সপ্লোর করার প্রবণতা অত্যন্ত বেশি; একটু সঠিক দিকনির্দেশনা দিলে তারা অসাধারণ কিছু করতে পারে। কুরতুবী আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ মো. রেজাউল করিম বলেন, দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞানমনা ও দেশপ্রেমিক প্রজন্ম গড়ে তুলতেই তারা বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক সহায়তা অব্যাহত রাখবে। মাদরাসার চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ খানের মন্তব্য, এই আবিষ্কার দেশের পুষ্টি চাহিদা মিটাতে ভূমিকা রাখবে এবং সঠিক সহায়তা পেলে তৃণমূল পর্যায়ে সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে।

টাঙ্গাইল শহরের সাবালিয়ায় 1999 সালে প্রতিষ্ঠিত কুরতুবী মাদরাসা এর আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার মনোভাবের ফল হিসেবে এই ছাত্রীদের সাফল্যকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। সুযোগ, গবেষণাসহায়তা ও বিতর্কভিত্তিক সচেতনতা থাকলে দেশের নারীরাও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দিতে পারবে—এই প্রত্যাশা নিয়ে তারা পথ চলা চালিয়ে যেতে চায়।

পোস্টটি শেয়ার করুন