মঙ্গলবার, ৩০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি সংকটের চাপে দেশের পোশাক শিল্পের দুর্বিসহ পরিস্থিতি

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পরিচালিত সামরিক অভিযান আপাতত শেষ হলেও বাংলাদেশ এখনো মারাত্মক জ্বালানি সংকটে ভুগছে। বিশেষ করে দেশের বেশিরভাগ রপ্তানি আয়ের মূল খাত পোশাক শিল্পের ওপর এর প্রভাব ভয়াবহ আকারে পড়ছে। দেশের স্পিনিং, নিটিং ও ডায়িং কারখানাগুলো প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যালের ব্যবহার করছে। বাংলাদেশে প্রায় ৯৫ শতাংশ তেল ও গ্যাস উপসাগরীয় এলাকা থেকে আসে, ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এই শিল্পে তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। গত ৬ জুন ঢাকায় বড় এক পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আল-মুসলিম গ্রুপ তাদের নিটওয়্যার ও ডেনিম কারখানায় প্রায় দুই হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করে।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে বর্তমানে চার লাখের বেশি মানুষ কাজ করেন, যাদের বেশিরভাগই নারী। তারা জারা ও এইচঅ্যান্ডএমের মতো পশ্চিমা ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করে থাকেন। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ, অর্থাৎ চার কোটি মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। গত বছর বাংলাদেশি পোশাক খাতের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশই এসেছে, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১৩ শতাংশ। এই কারণে চীনেক পরে বাংলাদেশের নাম বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক হিসেবে স্বীকৃত।

তবে, এই গুরুত্বপূর্ন শিল্পগত সংকট শুরু থেকেই বিদ্যমান। ২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের কারণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা কমে যায়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, কারখানা বন্ধ এবং আগুনে পুড়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় শিল্পের ক্ষতি হয়। গত তিন বছরে দেশের চারশোর বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

এ সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহও অসুবিধাজনক হয়ে পড়েছে। ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় প্রায় প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলে, চট্টগ্রামে সময়ের সঙ্গে তার মেয়াদ আরও বাড়ছে। অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে, যা কারখানার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভের আবিল বিন আমিন বলেন, এই শিল্পের জন্য শক্তি সংকট তার উৎপাদন সময় ও ব্যয়কে আরও বেশি করে জটিল করে তুলছে। ফেব্রুয়ারি থেকে মে—এই সময়ের মধ্যে উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ক্রেতাদের চাহিদা কমে যাওয়ায় অর্ডার মার্কেটেও প্রভাব পড়ছে। একটি জ্যাকেট কারখানার মালিক আবদুল্লাহ হিল নকিব জানান, যুদ্ধ শুরুর পর তার কারখানার ক্রয়াদেশ প্রায় বিশ শতাংশ কমে গেছে। বাংলাদেশ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, মে মাসে পোশাক রপ্তানি গত দশ মাসের মতোই কমে গেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে তুলনায় আট শতাংশ কম।

অতিরিক্ত তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কাঁচামালের খরচও বেড়েছে। পোশাক তৈরির বহু উপকরণ পেট্রোকেমিক্যাল ভিত্তিক, যেমন রং, ফিনিশিং কেমিক্যাল, প্লাস্টিক বাটন ও চেইন। দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ পোশাক পলিয়েস্টার ফাইবার ও সুতা দিয়ে তৈরি, যার মূল উপাদান ন্যাফথা। যুদ্ধের শুরু থেকে এর দাম এক-তৃতীয়াংশ বেড়ে গেছে। আরো মোকাবিলা করতে হচ্ছে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার খণ্ডিত পরিস্থিতি, যার কারণে ব্যয় বেড়েছে অন্তত ৩০ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক মে মাসে এই শিল্পের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তবে এই ঋণের সুদ হার প্রায় ৭ শতাংশ, যা চাপে থাকা প্রতিষ্ঠানের জন্য খুবই কঠিন। এর মধ্যেই বড় বড় ব্র্যান্ডগুলোর অর্ডার কমে যাওয়ায়, শ্রমিক ছাঁটাই ও অস্থিরতার আশঙ্কা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৮০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যেখানে প্রায় ৯৫০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে অপ্রত্যাশিত শ্রমিক উত্থান ও নানা ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন