বাংলাদেশে চলতি বছর হাম-রুবেলা মহামারীতে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ৯২ শতাংশই টিকার কোনও ডোজ পাননি। গত ১৫ মার্চ থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত দেশে হাম-রুবেলার উপসর্গে মোট ৭০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ২৬ শতাংশের বয়স ছিল এক বছরের কম। এই তথ্য শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞদের সভায় তুলে ধরা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের তথ্য বলছে, নির্দিষ্ট সময়ে হামের উপসর্গে ৬১৫ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হাম-রুবেলায় ৯৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। রোগতত্ত্ববিদরা মনে করেন, মহামারির সময় প্রতিটি মৃত্যুকেই হামজনিত মৃত্যু হিসেবে গণ্য করা হয়।
কলম্বোতে ২২ ও ২৩ জুন অনুষ্ঠিত ডব্লিউএইচও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের এই বিশেষজ্ঞ সম্মেলনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিস্তারিত উপস্থাপন করেন হাম ও রুবেলা নির্মূল কার্যক্রমের জাতীয় কমিটির (এনভিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান। তিনি আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক। এই প্রতিনিধিদলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একজন সহকারী সচিব, ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং ডব্লিউএইচও ঢাকা কার্যালয়ের রোগ প্রতিরোধবিষয়ক কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হলো শিশুদের হাম প্রতিরোধক্ষমতার অভাব এবং টিকাদান কর্মসূচিতে নজরদারির ঘাটতি। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় ৯ মাস বয়সে হাম-রুবেলার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার বিধান থাকলেও, মৃত শিশুদের কেবল ৮ শতাংশই এই টিকার আওতায় এসেছেন।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি, তা ২৬ শতাংশ পর্যন্ত। এরপর রয়েছে ২ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুর ১৮ শতাংশ, ৯ থেকে ১১ মাসের ১৪ শতাংশ, ১ থেকে ২ বছর এবং ৫ থেকে ৯ বছর বয়সের শিশু প্রত্যেকে ১৩ শতাংশ করে, ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৪ শতাংশ, এবং ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে ১২ শতাংশ। এই তথ্যের মাধ্যমে স্পষ্ট যে কেবল শিশুরাই নয়, বড় বয়সের ব্যক্তিরাও এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে।
অতিরিক্তভাবে, হামের উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত ৯৮ হাজার ২৬৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যেখানে ১১ হাজার ৫৯৪ জনের নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭৮ হাজার ২৮৭ জন।
অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, কলম্বোতে উপস্থাপিত তথ্য জুন মাসের প্রথমার্ধের। এতে দেখা গেছে, মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশই হাম-রুবেলার টিকা পায়নি। জুনের শেষ সপ্তাহে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে সাতশোর বেশি হলেও, টিকা না পাওয়ার হার একই রকম থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল মন্তব্য করেছেন, টিকাদান কর্মসূচির ত্রুটির কারণে অনেক শিশুকেই পর্যাপ্ত টিকা দেওয়া হয়নি। তিনি বলছেন, অনেক তথ্যই ছিল ভুল, কারচুপি করা হয়েছে, নজরদারির ব্যবস্থা ছিল না এবং জবাবদিহিতার অভাব ছিল। এর ফলে শিশুরা এই মহামারীর নির্মম শিকার হচ্ছে।
এছাড়াও, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের, নেপালের, থাইল্যান্ড ও মালদ্বীপের মহামারীর ঘটনা দেখা যাচ্ছে। কলম্বোতে অনুষ্ঠিত এই সভায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি খুবই গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হয়। ২৫ জুন ডব্লিউএইচও এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ অঞ্চলের হাম মোকাবিলার জন্য জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানায় এবং বাংলাদেশে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের পাঠানোর প্রস্তাবও দেয়।
ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক কমিশন নিজস্বভাবে কাজ করে এবং সদস্যদেশগুলো থেকে প্রাপ্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে হাম নির্মূলের অগ্রগতি মূল্যায়ন করে। দেশের প্রতিটি জেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা হাম-রুবেলা ও অন্যান্য রোগের তথ্য সংগ্রহ করেন, যা সাপ্তাহিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।