লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়াম যেন গতকাল এক আবেগঘন সিনেমার ক্লাইম্যাক্স দেখেছিল। ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অফ ৩২-এর প্রথম ম্যাচ ইনজুরি টাইমের শেষ মুহূর্তে এসে দাঁড়ালে স্কোরবোর্ডে ছিল ০-০। ঠিক সেই স্নায়ুচাপের মুহূর্তে কানাডার মিডফিল্ডার স্টিফেন ইউস্তাকিও দারুণ এক হাফ ভলিতে বল জালে জড়ান — এবং মুহূর্তেই স্টেডিয়াম মুখরিত হয়ে ওঠে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডি-বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া সেই শক্তিশালী শটে দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞ গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামসও থামাতে পারেননি। ওই একটিতেই ইতিহাস গড়ল সহ-আয়োজক কানাডা: বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো তারা নিশ্চিত করল শেষ সোলো বা নকআউট পর্বে উঠার টিকিট। ২৯ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারের ক্যারিয়ারে এটি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে মূল্যবান ও স্মরণীয় গোল।
কিন্তু স্টিফেনকে শুধু এক নম্বর ফুটবলারের কাতারে ধরে নেওয়া হলে ভুল হবে। মাঠে দিতে দেখা ওই সমস্ত শক্তি ও অবিচল মনোবল ছিল ব্যক্তিগত দ্রোহ ও শোকে গড়া। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে তাঁর মা এসমেরালদা ক্যান্সারে মারা যান। এক বছর পর অপ্রত্যাশিতভাবে হার্ট অ্যাটাকে নিজ বাবাকেও হারাতে হয় তাকে। জীবনের এত বড় ধাক্কা সত্ত্বেও ইউস্তাকিও ভেঙে পড়েননি; বরং সেই বেদনাকেই বানিয়েছেন নিজের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। এই কঠিন সময়ে তার ও তার প্রেমিকা কনস্টান্টার কোলের জীবনে আলো জुगিয়েছে তারা: একটি কন্যাসন্তান, বেনেদিতা।
ম্যাচ শেষে সাক্ষাৎকারে আবেগ ধরে রাখতে না পেয়ে ইউস্তাকিও কাঁদতে কাঁদতেই বলেছিলেন, “আমি মাঠে যা করি সবই আমার পরিবারের জন্য — আমার প্রয়াত বাবা-মা, আমার প্রেমিকা, আমার মেয়ে, আমার ভাই এবং দেশের সব সমর্থকদের জন্য।” আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের এক সাক্ষাৎকারে বড় ভাই ও ইন্টার টরন্টো এফসির প্রধান কোচ মাউরো ইউস্তাকিও জানিয়েছেন, দু ভাই সচেতনভাবে এই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মাউরো বলেছিলেন, “আমাদের বাবা-মা আমাদের উড়ার জন্য ডানা দিয়েছিলেন, এখন সেই উড়ানের দায়িত্ব আমাদের।”
স্টিফেনের ফুটবল যাত্রা পর্তুগিজ কমিউনিটির লিমিংটন, ওন্টারিও থেকে শুরু। ছোটবেলায় কানাডার বয়সভিত্তিক দলে অংশ নিয়েছিলেন, তবে কিছু সময় পর্তুগালের অনূর্ধ্ব-২১ দলে খেললেও ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্থায়ীভাবে কানাডার সিনিয়র জাতীয় দলে খেলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ছিলেন ২০২১ সালের গোল্ড কাপ, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ এবং ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে কানাডার হয়ে মাঠ মাতানো খেলোয়াড়দের একজন।
রবিবারের ঐতিহাসিক ম্যাচে নিয়মিত অধিনায়ক আলফোনসো ডেভিস ইনজুরির কারণে প্রথম একাদশে ছিলেন না; তাই দলের অন্তর্বর্তীকালীন অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন ইউস্তাকিও। এটি ছিল তার কানাডার হয়ে ৬১তম ম্যাচ এবং ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ গোল—তবে সবচেয়ে মহামূল্যবানটি বলেই মনে করায়।
গোলের পর আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেছিলেন, “শট নেওয়ার সময় মনে হচ্ছিল পুরো দেশটা আমার সঙ্গে শটটা নিয়েছে — সবাই অল্প অল্প করে শক্তি জুগিয়েছে, আর বলটা গিয়ে জালে আছড়ে পড়েছে।” দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে ক্যানাডা এখন শেষ সোলোর বড় লড়াইয়ের অপেক্ষায়। আগামীকাল নেদারল্যান্ডস ও মরক্কোর ম্যাচের বিজয়ীর বিরুদ্ধে তারা কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার লড়াইয়ে নামবে—আর স্টিফেন ইউস্তাকিওয়ের সেই অনড় মনোবল ও পরিবারের স্মৃতি তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে থাকবে।