কিলিয়ান এমবাপ্পে মানেই গতি, ঝাঁপ, এবং প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগের জন্য দীর্ঘ শ্বাস-প্রশ্বাসের বিরতি। এখনই বিশ্বকাপের নকআউটে সুইডেন সব আয়োজন কেবল একটার জন্য — এমবাপ্পেকে মাঠে আটকে দেওয়া। ফরাসি স্ট্রাইকারের চঞ্চল গতিবিধি ও ড্রিবলিং যে কোনো মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, সেটাই বোঝাতে বাধ্য সুইডিশ শিবির। ফলে ম্যাচ শুরুর আগেই বিশেষ রণনীতিতে কাজ করছে তারা; পুরো ম্যাচজুড়ে এমবাপ্পের ওপর কড়া মনিটরিং থাকবে, এটিই তাদের মূল লক্ষ্য।
গ্রুপ পর্বে ১০ গোলের সঙ্গে শীর্ষে থেকে নকআউটে উঠেছে ফ্রান্স। সেনেগাল, ইরাক ও নরওয়েকে হারিয়ে ‘লে ব্লুজ’রা কোনো ভুল রাখেনি। তবে রাউন্ড অব ৩২-এর আগে কোচ দিদিয়ে দেশমকে দলের বাম প্রান্তের কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিতে হচ্ছে। থিও হার্নান্দেজ লেফট ব্যাক পজিশনে পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য পারফরম্যান্স দেখাতেই পারেননি। সেই কারণেই সুযোগে লুকাস দিনিয়েকে শুরুর একাদশে নামানোর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে—রক্ষণভার আরও শক্ত করা ও সঠিক ক্রস দিতে দিনিয়েকে আনা হতে পারে।
আক্রমণে দেশম দ্বারাকে ব্র্যাডলি বারকোলা-কে দেজিরে দুওয়ের বদলে বাম উইঙ্গারে নামানোর কথা ভাবছেন। বারকলার গতি, ড্রিবলিং ও দ্রুত ট্রানজিশন ফরাসি ত্রয়ী—এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল অলিস—এর পাশে আক্রমণকে আরও সুসংহত করবে। এছাড়া সেন্ট্রাল ডিফেন্সে উইলিয়াম সালিবার প্রত্যাবর্তন ফরাসি রক্ষণের জন্য বড় সান্ত্বনা হবে।
সুইডেন সাধারণত রক্ষণাত্মক, শারীরিক ফুটবলে বিশ্বাস করে। গ্রুপ ‘এফ’-এ নেদারল্যান্ডসের পরে রানার্স-আপ হয়ে নকআউটে উঠেছে তারা। তিউনিসিয়ার বিপক্ষে ৫-১ জয়ের মতো উজ্জ্বল শুরু থাকলেও ডাচদের কাছে একই ব্যবধানে হার ও জাপানের সঙ্গে ড্র তাদের রূপ বদলে দেয়নি। আলেকজান্ডার ইসাক, ভিক্টর গিওকেরেস ও অ্যান্থনি ইলাঙ্গা থাকলেও ফরাসি ডিফেন্সকে ফাঁকি দিয়ে দ্রুত কাউন্টার আক্রমণে গোল করা সুইডেনের জন্য সহজ হবে না।
ইংলিশ কিংবদন্তি গ্যারি লিনেকার ফরাসি ক্রীড়া পত্রিকা লেকিপকে বলেছেন, তিনি সুইডেনের নাকি অচিরে বড় আচরণ দেখার সম্ভাবনা কম দেখছেন। তাঁর মতে, যদিও ইসাক ও গিওকেরেস ভালো খেলোয়াড়, তবু ফ্রান্সের গোল করার ক্ষমতার কাছে তারা কম পড়ে। লিনেকার সতর্কও করে দিয়েছেন—যদি ফ্রান্স চারজন খাঁটি ফরোয়ার্ড নিয়ে খেলতে থাকে, তাহলে কাউন্টার আক্রমণে ঝুঁকি বাড়ে, যেমনটি নরওয়ে ম্যাচে দেখা গেছে। তবুও সামগ্রিকভাবে ফ্রান্সের আক্রমণ ক্ষমতা অনেকটাই বেশি।
নকআউট ম্যাচে বিজয়ী হলে পরবর্তী স্টেজে ফরাসিদের প্রতিদ্বন্দ্বী হবে জার্মানি ও প্যারাগুয়ের জয়ীর মুখোমুখি দল। ২০১৪ সালের পর আবারও নকআউট ম্যাচে হার না মানা রেকর্ড বজায় রাখতে ফ্রান্স আজ মাঠে ফেভারিট হিসেবেই নামবে।
আরেকটি বড় আলোচনা—ফ্রান্সের আক্রমণ ত্রয়ী। এমবাপ্পে, দেম্বেলে ও অলিসের সমন্বয়ে গঠিত এই ত্রয়ী এখনও পর্যন্ত কোনো ম্যাচে সমানভাবে ঝরে পড়েনি, কিন্তু গ্রুপ পর্বে এই তিনজন মিলে প্রতিপক্ষের বুকে কম্পন সৃষ্টি করেছে। এমবাপ্পে করেছেন ৪ গোল; দেম্বেলেকে আমরা নরওয়ের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিকে দেখেছি—তারও গোলসংখ্যা চার; ব্র্যাডলি বারকোলা ও দেজিরে দুয়ে এক করে গোল করেছেন। সাধারণত এই ত্রয়ীর কেউ কেউ কোনো ম্যাচে ছায়া ফেললেও বাকি দুজন সেই ঘাটতি মিটিয়ে দিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, যদি একসঙ্গে তিনজনে চূড়ান্ত ফর্মে উঠতে পারে, তাহলে ফ্রান্সের আক্রমণ সৃষ্টি, ধারালো ও অতি দ্রুত হয়ে উঠবে।
তবু ফরাসি আক্রমণের স্বাধীনতার দাম আছে—পূর্ণব্যাকরা অনেক সময় ওপরে উঠে যাওয়ায় মাঝমাঠে ফাঁক পড়ে এবং প্রতিপক্ষের জন্য কাউন্টার আক্রমণের সুযোগ তৈরি হয়। এই কারণে মাঝমাঠের খেলোয়াড়দের ওপর চাপ বেড়ে যায়। তবু দিদিয়ে দেশম আক্রমণের শক্তিকে কাজে লাগাতে কখনো রক্ষণের সামান্য নিরাপত্তা বিসর্জন করতেও দ্বিধা করছেন না।
শেষ পর্যন্ত, মঙ্গলবারের লড়াই হবে কৌশল বনাম কৌশল—সুইডেনের কড়া রক্ষণভাগ ও শারীরিক খেলা কি এমবাপ্পে-ভিত্তিক ফরাসি গতিধারাকে দমন করতে পারবে, নাকি ফ্রান্স তাদের আগ্রাসী ত্রয়ী দিয়ে সুইডিশ প্রতিরোধ ভাঙবে। ইতিহাসও এই লড়াইকে চোখ রাখছে: মোট মুখোমুখি ম্যাচ ২৩টিতে ফ্রান্স জয় পেয়েছে ১২টি, সুইডেন ৬টি এবং ড্র হয়েছে ৫টি।