রবিবার, ৫ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নওগাঁয় ছয় মাসে ২৫ লাশ উদ্ধার, হত্যাকাণ্ড বাড়ায় নাশকতা ও উদ্বেগ

নওগাঁ জেলায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পুলিশ অন্তত ২৫টি লাশ উদ্ধার করেছে। হত্যাকাণ্ড, পারিবারিক সহিংসতা এবং রহস্যজনক মৃত্যু–এই তিনটি ঘটনার জেরেই জেলার মানুষ এখন উদ্বেগগ্রস্ত। একের পর এক মৃতু্যুর খবরের ফলে পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হারানো, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট বেড়েছে।

স্থানীয় ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, জমিজমা ও দেনাদারে বিরোধ, মাদকপান, নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার মিলেমিশে এই পরিস্থিতি তীব্র করছে। বিশেষত বেকারত্ব, হতাশা ও ভিন্নদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণও তরুণদের অপরাধে জড়াতে প্ররোচিত করছে বলে তারা জানান।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ ঘটনা পারিবারিক ঝগড়া, জমি-সত্ত্বা বিবাদ বা মাদক সংক্রান্ত বিবাদে সংঘটিত হয়েছে। নিচে এ ছয় মাসে ঘটিত কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

– ২৯ জুন মহাদেবপুর উপজেলার ছোট মহেশপুর গ্রামে জমি সংক্রান্ত বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন নিয়ে বিরোধের জেরে ভাতিজা চপলের হাতে চাচা আব্দুল জব্বার (৬৫) নিহত হন।

– ২৮ জুন সদর উপজেলার নামাজগড় এলাকার গাউসুল আজম কামিল মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির আব্দুল্লাহ আল নিরব (১৪) মাদ্রাসা সংলগ্ন এলাকা থেকে নিহত অবস্থায় উদ্ধার হন। তিনি পাবনার আটঘরিয়ার রুবেল হোসেনের ছেলে।

– ১৭ জুন আত্রাই উপজেলার শাহাগোলা রেললাইন সংলগ্ন এলাকা থেকে শিক্ষক নেয়ামুল বাশির (৫৩) এর লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি আত্রাই রেলস্টেশন থেকে অটোরিকশায় নওগাঁ শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন; এরপর থেকেই তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। ঘটনার পর অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে এবং দ্রুত খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবি করা হয়েছে।

– ৮ জুন মান্দা উপজেলার হাটোর গ্রামে মাদক ব্যবসায়ীদের মারধরে তৈয়বুর রহমান মোল্লা (৬৫) নিহত হন।

– ৭ জুন একই উপজেলার ছুটিপুর গ্রামে জমি সংক্রান্ত বিরোধে লাঠির আঘাতে আব্দুল হামিদ (৬৫) নিহত হন।

– ৩ জুন সাপাহার উপজেলার পুনর্ভবা নদীর বলদিয়াঘাট এলাকা থেকে একদিন পর মানসিক ভারসাম্যহীন কিশোর সিফাতের লাশ উদ্ধার করা হয়।

এছাড়া আরও নানা কেবলি ঘটনায় মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে—

– ৭ মে নওগাঁ সদর উপজেলার আরজি-নওগাঁ এলাকায় বিয়ের দেড় মাস পরে যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূ ফাল্গুনিকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ স্বামীর বিরুদ্ধে।

– ২০ এপ্রিল নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে জমি বিরোধে একই পরিবারের চার সদস্যকে গলাকেটে হত্যা করা হয়: হাবিবুর রহমান (৩৫), তার স্ত্রী পপি সুলতানা (২৫), ছেলে পারভেজ রহমান (৯) ও মেয়ে সাদিয়া আক্তার (৩)।

– ২ এপ্রিল সদর উপজেলার গোয়ালি উত্তরপাড়া এলাকা থেকে মিনতি (৩০) নামে এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

– ১ এপ্রিল পোরশা উপজেলার শীতলি ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে স্বামীর মারধরে মরজিনা খাতুন রুপসি (২৬) প্রান হারান; তাঁর ছয়টি সন্তান পিতৃহীন হয়ে পড়েছে বলে পরিবারজনে জানায়।

– ৩১ মার্চ নওগাঁ শহরের বাইপাস বরুণকান্দি এলাকায় একটি গ্যারেজে রাখা বাস থেকে বাসের হেলপার জাহিদ ইসলাম (২২) এর লাশ উদ্ধার করা হয়।

– ২৬ মার্চ পত্নীতলা উপজেলার আত্রাই নদীর কাঞ্চন গ্রাম এলাকা থেকে অঞ্জনা কর্মকার (৪৫) নামক এক নারীর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

– ৬ মার্চ আত্রাই উপজেলার বলরামচক গ্রামে মাদকাসক্ত জয় সরকার (২৫) তাঁর স্ত্রী বৃষ্টি রানী (২০) ও কন্যা জিনি (২.৫) কে হত্যা করে পরে আত্মহত্যা করেন।

– ৫ মার্চ মান্দা উপজেলার একটি কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানায় চোর সন্দেহে রফিকুল ইসলামকে (৪৫) পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে।

– ফেব্রুয়ারি ও জানুয়ারিতেও অনেকে ঝুলন্ত ও দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার হন: প্রতিমা রাণী (২৪), তুন্নাহার বেগম (১৯), নুপুর (২৬), মিতু বানু এবং বাসন্তী রানী (২৫) ইত্যাদি। ১৮ জানুয়ারি ধামইরহাটের নানাইচ গ্রামে সিরিয়াল কিলার গোলাম মোরশেদের হামলায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত কলেজছাত্রী উম্মে হাবিবা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

হতাহতদের পরিবারগুলোতে এখন চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকট। পোরশা উপজেলার নীতপুর গ্রামের দরিদ্র বৃদ্ধ মশিউর রহমান বলেন, জামাই সাবেক কারাগারে থাকায় তাঁর মেয়ে মরজিনা খাতুনের (রুপসি) ছয়টি সন্তানই এখন তাঁরই চোখের সামনে; তারা গরিব হওয়ায় শিশুদের দেখাশোনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

আইনজীবী মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি হলে খুন, ধর্ষণসহ গम्भীর অপরাধ বাড়ে। তিনি মনে করেন—ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের জোরদারকরণ ঘটালে এসব অপরাধ অনেকাংশে কমানো যাবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

নওগাঁ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, জেলার অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডই পারিবারিক বিরোধ ও রাগ-ক্ষোভ থেকে সংঘটিত হয়েছে; তাই ভাই-ভাই, স্বামী-স্ত্রী এমনকি স্কুলপড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরাও নানা অপরাধে জড়াচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করেছেন এবং অপরাধ দমনে পুলিশ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয়রা দাবি করছেন দ্রুত বিচার ও শক্ত হাতে অপরাধ দমনসহ সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এবং নৈতিক শিক্ষাকে শক্ত করার মাধ্যমে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা উচিত। পরিবার ও সমাজকে আরো সংহত করে মাদক, বেকারত্ব ও জমিজমা বিরোধের মতো প্রলোভন ও সংঘাত ঘুচিয়ে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাই আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন