ফেব্রুয়ারি ২৮—ইরানের মিনাবে শাজারেহ তাইয়িবা স্কুলে মার্কিন বিমান হামলায় অন্তত ১৬৮ শিশু নিহত হয়েছেন, যা সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক ইতিহাসে অন্যতম প্রাণঘাতী বেসামরিক হতাহতের ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা বিভিন্ন সূত্র বলছে, এর পেছনে মূল কারণ ছিল পুরোনো ও আপডেট না করা গোয়েন্দি তথ্য।
সিএনএনের তিনটি সূত্র জানায়, ইরানে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কিত অনেক তথ্য ডাটাবেসে থাকা সত্ত্বেও ওই বছরের গোয়েন্দি উপাত্ত বহু পুরনো—এবং তা পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ স্পষ্টভাবে ছিল। তবু সিনিয়র সামরিক কমান্ডাররা সেই সতর্কবার্তাগুলো উপেক্ষা করে একের পর এক হামলার অনুমোদন দেন। সেই তালিকার এক হামলায় স্কুলটিকে আঘাত করেছে, যেখানে প্রায় ২০০ শিশু-প্রাপ্তবয়স্ক হতাহত হওয়ার কথা বলা হয়।
ইরানের সরকারি গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুসারে ওই হামলায় অন্তত ১৬৮ শিশু ও ১৪ শিক্ষক নিহত হয়েছেন। সিএনএন প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ফুটে ওঠে কিভাবে গোয়েন্দি তথ্য পুরনো ছিল এবং কেন তা লক্ষ্যনির্ধারণের সময় তৎক্ষণাৎ যাচাই হয়নি।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৩ সালের ছবিতে স্কুল ও পাশের আইআরজিসি ঘাঁটি একই কমপাউন্ডের অংশ ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের ছবিতে স্কুলকে আলাদা করতে বেড়া ও পৃথক প্রবেশপথ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তোলা চিত্রে স্কুলের আঙিনায় কয়েক ডজন মানুষ খেলাধুলা করতেও দেখা গেছে—যা নির্দেশ করে এটি একসময়ে বেসামরিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
একজন বিশ্লেষক আগেই একটি গোয়েন্দি বিশ্লেষণ টুলে ওই স্থানের পরিবর্তনের নথিভুক্তি করেছিলেন। কিন্তু সেই টুলটি সরাসরি মূল লক্ষ্যনির্ধারণ ডেটাবেসের সঙ্গে যুক্ত ছিল না, ফলে সতর্কবার্তাটি कभीই কমান্ডারদের কাছে পৌঁছায়নি।
সূত্ররা বলেছেন, হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন এটি একটি খুব বড় ভুল—প্রধানত পুরনো তথ্যের কারণে। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন সামরিক ও গোয়েন্দি বিশ্লেষকরা লক্ষ লক্ষ তথ্য হালনাগাদ করার তাড়া শুরু করে। কিন্তু শুরুর আগেই সবকিছু হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি; ফলে বহু লক্ষ্যবস্তুর তথ্য ১০ বছরেরও বেশি পুরনো ছিল।
বিশ্লেষকরা প্রথমে চলমান ও উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুর তথ্য হালনাগাদে মনোযোগ দিয়েছিলেন—যেমন ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও বিমান—কারণ সেগুলোই সরাসরি বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। স্থায়ী বেসামরিক স্থাপনা, যেমন স্কুল-ঘেরা সামরিক স্থাপনা, তুলনামূলকভাবে নিম্ন অগ্রাধিকার পেয়েছিল এবং অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলোর তথ্য হালনাগাদ করা হয়নি।
লক্ষ্যনির্ধারণে ব্যবহৃত ‘মডার্নাইজড ইন্টিগ্রেটেড ডেটাবেস’ (এমআইডিবি) ও নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘মার্স’-এ স্পষ্টভাবে লেখা ছিল যে ইরানভিত্তিক তথ্য ব্যবহারের আগে এগুলো হালনাগাদ করতে হবে। তবে মার্সে রূপান্তরের কাজ নির্ধারিত সময়ের তুলনায় অনেক দেরিতে সম্পন্ন হয়েছে, ফলে এমআইডিবিই প্রধান তথ্যভাণ্ডার হিসেবে রয়ে যায়।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নেতৃত্বে বেসামরিক হতাহত কমানোর কর্মসূচিতে আনা বড় ধরনের কাটছাঁট। সূত্রগুলো বলছে, ওই কর্মসূচির অধীনে সামরিক কমান্ডগুলো থেকে জনবল ৯০ শতাংশেরও বেশি কমিয়ে দেওয়া হয়—সেন্টকমের দশ সদস্যের দলকে এক জন পূর্ণকালীন কর্মী পর্যন্ত নামিয়ে আনা হয় এবং হামলা-পরিকল্পনা দলে থাকা বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি বিশেষজ্ঞদেরও সরিয়ে দেয়া হয়। ফলত সেন্টকমের দল তাদের দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় জনবল ও রিসোর্সে সক্ষম ছিল না।
হামলার পর ট্রাম্প প্রথমে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ইরান এ ঘটনার জন্য দায়ী হতে পারে, পরে তিনি বলেছেন, ‘‘এর দায় কার তা হয়তো কখনোই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।’’ প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ ঘোষণা করেছেন যে ঘটনাটি ‘‘পূর্ণাঙ্গ’’ভাবে তদন্ত করা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সবরকম প্রচেষ্টা করেছে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, তদন্ত এখনও চলছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কখনোই বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে না।
পেন্টাগন ইস্যু সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো সেন্টকমের কাছে পাঠিয়েছে, কিন্তু চলমান তদন্ত বলেই সেন্টকম মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছে। কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও পেন্টাগন এখনো এই ঘটনার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে গোয়েন্দি তথ্যের সংস্কার, লক্ষ্যনির্ধারণ প্রক্রিয়ার ত্রুটিগুলো এবং বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোর কর্মসূচির জনবল সংস্কৃতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও মন্তব্য চলছে।